সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রপ্রধান-সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টকে ‘যোদ্ধা’ ও ‘নেতা’ হিসেবে প্রশংসা করলেন ট্

  • বিশেষ প্রতিবেদন
  • ২০২৫-০৫-১৫ ০১:৩৪:৩৮
ছবি সংগৃহিত

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড়। বিশ্ব রাজনীতির বিতর্কিত খেলোয়াড় ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার নতুন ভূমিকায়-সিরিয়ার সদ্য অভিষিক্ত প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। ‘সুদর্শন, শক্তপোক্ত, অতীতে একজন প্রকৃত যোদ্ধা’-এভাবেই ব্যাখ্যা করলেন ট্রাম্প, যিনি বুধবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে শারাকে নিয়ে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন।
আহমেদ আল-শারার নামটি অনেকের কাছে এখনও অচেনা হতে পারে, তবে তার পূর্বনাম-আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি-জঙ্গিবাদের এক পরিচিত ছায়া। আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট আল-নুসরা ফ্রন্ট থেকে ভাঙন ধরে তৈরি হওয়া হায়াত তাহরির আল-শাম সংগঠনের শীর্ষ নেতা ছিলেন তিনি। একসময় যিনি পশ্চিমা বিশ্বে সন্ত্রাসী নেতার পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন, আজ সেই ব্যক্তি সিরিয়ার সর্বোচ্চ পদে-রাষ্ট্রপতি।
ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর শারার নেতৃত্বেই গঠিত হয় নতুন প্রশাসন। আর সেই প্রশাসনের প্রধান মুখ এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজছেন।
ট্রাম্পের মুখে শারাকে ঘিরে যেভাবে প্রশংসা ঝরেছে, তা কেবল সৌজন্য নয়-বরং রাজনৈতিক বার্তাও। ট্রাম্প বলেন,
“সে একজন সুদর্শন তরুণ, শক্তিশালী অতীত রয়েছে তার। সে একজন যোদ্ধা। এবং আমি মনে করি, তার মধ্যে নেতৃত্ব ধরে রাখার আসল ক্ষমতা আছে।”
ট্রাম্প আরও জানান, সৌদি আরবে তাদের মধ্যে ‘দুর্দান্ত’ সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তিনি এরদোগানের সঙ্গেও শারার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তুরস্ক ইতিমধ্যেই শারার সরকারকে ‘গঠনমূলক নেতৃত্ব’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
সাক্ষাতের ফলাফল শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার উপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বিবৃতিতে বলা হয়, “সিরিয়ায় নতুন বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে-যেখানে জঙ্গিবাদবিরোধী আগ্রাসী ন্যারেটিভের বদলে, স্থিতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণই এখন মুখ্য।
ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি সিরিয়াকে এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এবং আমি তাকে বলেছি, যখন সেটি সম্ভব হবে, তখন আশা করি, সে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টায় সিরিয়াকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে-যা এখনো অনেকে অকল্পনীয় বলেই মনে করেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করছেন দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে। কেউ বলছেন, এটি একটি বিপজ্জনক বৈধতা প্রদান, যেখানে এক সময়ের জঙ্গি সংগঠনের নেতা এখন রাষ্ট্রনেতা হিসেবে পশ্চিমা স্বীকৃতি পাচ্ছেন। আবার অন্য একদল মনে করেন, সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত করে রাখা থেকে উত্তরণের জন্য এটাই বাস্তবধর্মী কৌশল।
হায়াত তাহরির আল-শাম এখনও জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকায় রয়েছে। তাহলে তাদের সাবেক নেতার নেতৃত্বাধীন সরকারকে কীভাবে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে?
সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া। শারার সরকার এবং মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে তারা কিভাবে দেখবে?
সৌদি, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন শারার সঙ্গে এক ছাতার নিচে? তাহলে কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তিবিন্যাস তৈরি হচ্ছে?

আহমেদ আল-শারা এখন কেবল সিরিয়ার প্রেসিডেন্টই নন-তিনি এক যুগান্তকারী পরীক্ষা। তার অতীত রক্তাক্ত, বর্তমান জটিল, এবং ভবিষ্যত কূটনীতির উপর নির্ভর করছে। ট্রাম্পের প্রশংসা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্ভাব্য আব্রাহাম চুক্তিতে অংশগ্রহণ-এই সবকিছুই ইঙ্গিত করছে, একটি নতুন সিরিয়া জন্ম নিচ্ছে।
তবে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে: এই সিরিয়া শান্তির বাহক হবে, না চোরাবালির আরেক নাম হয়ে উঠবে?


এ জাতীয় আরো খবর