মধ্যপ্রাচ্যের বুকে যেন নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রচনা হলো। কাতারের রাজধানী দোহায়,চোখ ধাঁধানো আলো ঝলমলে প্রাসাদে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কলম থেকে উঠে এল এক মহাযজ্ঞের স্বাক্ষর-২৪৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তি, যার বিস্তার ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবাহের প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
এই চুক্তিকে অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অন্যতম বৃহৎ এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের পদক্ষেপ। তবে এটিকে শুধুই আর্থিক লেনদেন বলে ভুল করবেন না। এর পেছনে রয়েছে ভূরাজনীতির সূক্ষ্ম শীতল উত্তাপ, প্রযুক্তি-অস্ত্রের আধিপত্য এবং এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকার পর্দার পেছনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের সম্ভাবনা।
এই চুক্তির বড় অংশজুড়ে রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজের মার্কিন কোম্পানি বোয়িং এবং জিই অ্যারোস্পেস থেকে ২১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৭৭এক্স বিমান কেনার ঘোষণা, যার মূল্য ৯৬ বিলিয়ন ডলার। এটি শুধুই একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য উড়োজাহাজ শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখার এক কৌশলগত চ্যালেঞ্জের জবাব।
যুক্তরাষ্ট্রের রেথিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের ‘কাউন্টার-ড্রোন’ ব্যবস্থা এবং জেনারেল অ্যাটমিক্স থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের MQ-9B সশস্ত্র ড্রোন কিনছে কাতার। এই বিনিয়োগ কেবল আত্মরক্ষা নয়-মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক সামরিক ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতকে শক্তিশালী করতেই এই চুক্তি।
চুক্তিতে আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের যৌথ প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এটি এমন এক ঘাঁটি, যা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই নতুন বিনিয়োগ আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকে শুধু দীর্ঘস্থায়ীই করবে না, বরং ইরান ঘেঁষা অঞ্চলজুড়ে আরও গভীর নজরদারি এবং প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা নিশ্চিত করবে।
চুক্তির আরেকটি চমক: কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে যৌথ সহযোগিতা। এটিই ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত শক্তির মূল চালিকাশক্তি। কাতার চাইছে এ খাতে মার্কিন উদ্ভাবনী শক্তি থেকে লাভবান হতে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগে চীনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে আরেকটি ‘ডিজিটাল ঘাঁটি’ বসাতে চলেছে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, “এই চুক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের লাখো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং কাতারের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।” তবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ট্রাম্প ২০২৪-পরবর্তী সময়ের জন্য নিজেকে আবার বৈশ্বিক পরিসরে প্রস্তুত করছেন।
এই চুক্তিকে তারা দেখছেন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং’ প্রচার হিসেবে, যেখানে তিনি নিজেকে একজন কৌশলগত নেতার মতো তুলে ধরছেন-যিনি যুদ্ধ নয়, বাণিজ্য এবং অংশীদারিত্ব দিয়ে বিশ্ব পরিচালনা করতে চান।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, “এ ধরনের চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা প্রশ্নে প্রশ্ন তোলে।” ইরান সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানালেও, আল-উদেইদ ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে বরাবরের মতোই উদ্বিগ্ন।
এদিকে ইউরোপের কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই চুক্তি কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘আঞ্চলিক সুপারপাওয়ার’ রূপে গড়ে তুলতে পারে, যা সৌদি-ইউএই বলয়ের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
দোহায় ট্রাম্পের এই চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের দলিল নয়-এটি বিশ্বরাজনীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কাতারকে পাশে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বুঝিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্যে তার আগ্রহ এখনো অটুট এবং আধিপত্য কৌশলে এখনো তারই সিলমোহর।
এখন প্রশ্ন একটাই: এই চুক্তি বিশ্বশান্তির পথে নতুন দিগন্ত খুলবে, না কি আরও একটি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দেবে? সময়ই দেবে উত্তর।