শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬

শিলাবৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞান ও কোরান হাদিসের ব্যাখ্যা এবং পরামর্শ

  • সরদার কালাম
  • ২০২৫-০৫-০৩ ১৩:০৬:৫৬
ফাইল ছবি

শিলাবৃষ্টি নিয়ে কোরানী আলোচনা তুলে ধরলে সেখানে বলা হচ্ছে, তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন, অতঃপর তাকে পুঞ্জীভূত করেন, অতঃপর তাকে স্তরে স্তরে রাখেন; অতঃপর তুমি দেখ যে, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়।তিনি আকাশস্থিত শিলাস্তুপ থেকে শিলাবর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা,তা অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন।তার বিদ্যুৎঝলক দৃষ্টিশক্তি যেন বিলীন করে দিতে চায়। [সূরা নূর: 43]
এছাড়া আরো বলা হচ্ছে,আসমানে শিলার পাহাড় আছে; যেখান থেকে তিনি শিলা বর্ষণ করেন। (ইবনে কাসীর) 

দ্বিতীয় অর্থে বলা হচ্ছে, উঁচু আর পাহাড়ের সমতুল্য বড় বড় টুকরো।অর্থাৎ,মহান আল্লাহ আসমান হতে কেবল বৃষ্টিই বর্ষণ করেন না,বরং উঁচু থেকে যখন চান বড় বড় বরফের টুকরোও বর্ষণ করেন।
(ফাতহুল কাদীর) কিম্বা পাহাড় সদৃশ বিশাল বিশাল মেঘখন্ড হতে শিলা বর্ষণ করেন।যাদের প্রতি ইচ্ছা রহমত সরূপ তাদের উপর শিলা ও বৃষ্টি বর্ষণ করেন।আবার যাদেরকে ইচ্ছা তাদেরকে তা হতে বঞ্চিত রাখেন।
অথবা,যাদেরকে ইচ্ছা শিলাবৃষ্টির আযাবে পতিত করেন।যার কারণে খেতের ফসলাদি সব নষ্ট হয়ে যায়।আর যার উপর রহমত করেন তাকে উক্ত আযাব হতে বাচিয়ে নেন।
এবং মেঘের বিদ্যুৎ-ঝলক যাতে সাধারনতঃ বৃষ্টির সুখবর দিয়ে থাকে,তাতে এমন তীব্র জ্যোতি থাকে যে,মনে হয় তা যেন দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিবে।এটিও তার আজব কারিগরির একটি নমুনা।

এদিকে বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতেও শিলাবৃষ্টি নিয়ে বিসদ আলোচনা রয়েছে।
সাধারণত গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত গরমের সময় শিলাবৃষ্টি হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ফাগুন-চৈত্র বৈশাখ মাসেই শিলাবৃষ্টির প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মের আগেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াকেই এর কারণ বলে জানাচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।
গত কয়েক বছরের মতো এ বছরও চৈত্রের শেষে বৈশাখের মাঝেই শিলাবৃষ্টির প্রকোপ শুরু হয়েছে। সাধারণত, ভারি শিলাবৃষ্টির কারণে উঠতি ফসলসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তবে এবার দেশের সবাঞ্চলে শিলাবৃষ্টি না হলেও অনেক জেলাতেই সর্বশেষ শিলাবৃষ্টির সময় শিলার আকার বড় হওয়ায় বসতঘরের টিনের চাল ফুটো হওয়ার সংবাদ শোনা গেছে। 
জানা গেছে, অনেকে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।ফসলের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ না হলেও জীবনের ঝুঁকি এড়াতে সাধারণ মানুষকে পাকাবাড়ির নিচে অথবা নিরাপদ ছাউনির নিচে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণভাবে বলাযায়,আকাশে যখন মেঘের পরিমাণ অনেক বেশি হয় বা মেঘ অনেক বেশি ভারি হয় ওঠে, তখন বৃষ্টির সময় আকাশ থেকে বরফের টুকরা বা মেঘের কণা পড়ে থাকে; একেই শিলাবৃষ্টি বলা হয়ে থাকে।এর আগ ও মাঝামাঝি সময়ে জড় ও বজ্রপাতের ঘটনাও ঘটে থাকে আর তা থেকে নিরাপদ থাকতে সতর্কতার সহিত নিরাপদ স্থানে থাকারও পরামর্শ রয়েছে। 
আবহাওয়াবিদদের মতে,আবহাওয়া সংক্রান্ত যে ক্যালেন্ডার আছে, তাতে গ্রীষ্মকাল না বলে প্রাক-মৌসুমী সময় বলা হয়ে থাকে।আর তা সাধারণত মার্চ মাসের শেষের দিকেই শুরু হয়। কখনও কখনও ফেব্রুয়ারিতেও দেখা দেয়।
এক গনমাধ্যমে উঠেআসা বিজ্ঞানসম্মত তথ্যমতে আবহাওয়া অধিদফতর বলেছে,এসময়টিতে আকাশের কোথাও কোথাও ৩৪ থেকে ৩৫ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে আর ওইসময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দখিনা বাতাস আসতে পারে।
তার সঙ্গে যোগ হয় বিহার ও এর পাশের পশ্চিমবঙ্গে ‘হিট লো’ (তাপীয় লঘুচাপ) তৈরি হয়।আর বাংলাদেশের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকায় ‘হিট লো’গুলো সাধারণত তৈরি হয় বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে।
গরম বাতাস হিসেবে ‘হিট লো’ ধীরেধীরে এদেশের স্থলভাগের দিকে আসে।এরসঙ্গে যুক্ত হয় বঙ্গোপসাগর থেকে আগত জলীয় বাষ্পে পূর্ণ আর্দ্র বাতাস।এইদুইয়ের সঙ্গে সিলেট থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাসের সংমিশ্রণে তৈরি হয় মেঘ—মালা।
আর এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া মেঘমালাকে আবহাওয়া অধিদফতর বলে বজ্রমেঘ।এগুলো যখন ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭/১৮ কিলোমিটার উপরে উঠে যায়, তখন জ্বলীয় বাষ্প উপরে উঠে আরও ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং ছোট ছোট বরফ কণায় পরিণত হয়।এই ছোট ছোট বরফ কণা আশপাশের আরও বরফখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বড় শিলাখণ্ডে পরিণত হয়।
এই শিলাখণ্ড যখন বেশি ভারি হয়ে যায়,তখন তার ওজনকে আর বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে না। তখন এগুলো শিলাবৃষ্টি আকারে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে।
বায়ুমণ্ডলে থাকা শিলাখণ্ডগুলো অবশ্য অনেক বড় আকারে থাকে। মাটিতে ঝরে পড়ার সময় শিলাখণ্ডগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ছোট হয়ে যায় এবং তা ছোট ছোট আকারের শিলা হিসেবে নেমে আসে।
প্রতি বছর আবহাওয়া অধিদফতরের পক্ষ থেকে শিলাবৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে, শিলাবৃষ্টি শুরু হলে খোলা আকাশের নিচে থাকা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।
এসময় একটি ছাউনির নিচে থাকাটা নিরাপদ। তবে ছাউনিটা কংক্রিটের হলে সবচেয়ে ভালো হয়।কারণ, টিনের চালও একটু বড় আকৃতির শিলার আঘাতে ফুটো হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া শিলাবৃষ্টির সময় গাড়ি চালানো অবস্থায় থাকলে গাড়ি ধীরে চালানো উচিত। বাসায় থাকলে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। এমনকি ঝুলন্ত বিদ্যুতের তার স্পর্শ করা যাবেনা এবং বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে দ্রুত বিদ্যুৎ বিরতণ কোম্পানিকে জানাতে হবে। এদিকে দেশের পার্বত্য এলাকা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, পার্বত্য এলাকায় থাকলে কোনও গুহায় ঢোকা যাবে না। কারণ ভূমিধসের কারণে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার পাহাড়ের আশপাশে থাকলেও ভূমিধসের আশঙ্কা থাকতে পারে।
যদিও শিলাবৃষ্টি থেকে মানুষের জীবন রক্ষা পেলেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তেমন কোনও বড় ব্যবস্থার কথা জানা যায় নি। 
হয়তো উন্নত দেশে গ্রিন হাউজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হলেও তা স্বল্প পরিসরের ফসলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।তাছাড়া,আমাদের দেশে গ্রিন হাউজ প্রযুক্তির ব্যবহারও নেই।তাই শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া ছাড়া কোনও বিকল্প সরকারের পক্ষ থেকে থাকে না ।
আবহাওয়া অধিদফতর সুত্রমতে, অনেক সময় এই শিলাবৃষ্টি পড়ার গতি ঘণ্টায় ৬০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে।তবে সাধারণত ১৫ - ২০ মিনিটের বেশি শিলাবৃষ্টি হয় না। 
আর শিলাবৃষ্টিতে গড়ে একটা শিলার ব্যাস হয় ৫ থেকে ১৫০ মিলিমিটারের মধ্যে।শিলার ব্যাস পৌনে এক ইঞ্চি না হলে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির সম্ভাবনা তেমন থাকে না।তবে এরচেয়ে বড় ব্যাসের শিলা হলে ব্যাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিলার মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে থাকে।


এ জাতীয় আরো খবর