সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

গাজায় ধ্বংস,ক্ষুধা ও নীরব মৃত্যুর পেছনে ইসরাইল-আইসিজেতে কাতারের তীব্র অভিযোগ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৫-০২ ০১:৪৭:০১
ফাইল ছবি

২ মে ২০২৫
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের অবরোধ ও আক্রমণ কেবল সামরিক আগ্রাসন নয়, এটি একটি রক্তক্ষয়ী মানবিক বিপর্যয়-এমনটাই বলছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র কাতার। হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে কাতার সরাসরি অভিযোগ করেছে, ইসরাইল খাদ্য ও ত্রাণকে অস্ত্র বানিয়ে গাজায় একটি প্রজন্ম ধ্বংসে নেমেছে।
নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত কাতারি রাষ্ট্রদূত মুতলাক আল-কাহতানি আদালতে এক হৃদয়বিদারক উপস্থাপনায় বলেন, “ইসরাইল ত্রাণ-নির্ভর জনগোষ্ঠীর ওপর অনাহার চাপিয়ে দিয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে। এটা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়-এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।”

‘ত্রাণকে অস্ত্রে পরিণত করেছে ইসরাইল’
শুনানির শুরুতেই কাতার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, ইসরাইল এখন খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা-সবকিছুকে রাজনৈতিক চাপে পরিণত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করার নামান্তর।
আল-কাহতানি বলেন, “আজকের বিশ্বে ক্ষুধা কোন স্বাভাবিক দুর্যোগ নয়-গাজায় এটা ইসরাইলি রাষ্ট্রীয় নীতির ফল। যুদ্ধের নামে একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করা হচ্ছে। জাতিসংঘকেও তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছে।”

আইসিজে’র গুরুত্ব ও কাতারের অবস্থান
এই শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০২৩ সালের একটি প্রস্তাবের আলোকে। প্রস্তাবটিতে ইসরাইলের দখলদার নীতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ নিয়ে একটি আইনি পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। কাতারসহ ১৩৭টি দেশ ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়।
যদিও আইসিজে’র রায় বাধ্যতামূলক নয়, তবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরাইলের অপরাধের খতিয়ান তুলে ধরে কাতার
আল-কাহতানি আদালতে বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজাকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ইসরাইল। চিকিৎসা সামগ্রী, খাদ্য, পানীয়-সবকিছুতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যেসব মানবিক যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা বারবার লঙ্ঘন করেছে তেলআবিব।
তিনি বলেন, “ইসরাইল নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়। কোন সংস্থা গাজায় কাজ করবে, কোন দেশ সাহায্য পাঠাবে-সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের নেই। এটি শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।”

ইউএন সংস্থাকে নিষিদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের জীবনরেখা ছিন্ন
আল-কাহতানি আরও উল্লেখ করেন, ইসরাইলের সংসদ (নেসেট) সম্প্রতি দুটি বিল পাস করে UNRWA-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, যা গাজায় লক্ষাধিক মানুষের জন্য ছিল জীবনরক্ষাকারী সংস্থা। এই সিদ্ধান্তের ফলে সেখানে মানবিক বিপর্যয় আরও প্রকট হয়েছে।

গণহত্যার দায় এড়াতে পারবে না ইসরাইল
আল-কাহতানি স্পষ্ট করে বলেন, “ইসরাইল শুধু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে না, এটি করছে 'অপরাধের অপরাধ'-যার জবাব মানবতাকেই দিতে হবে।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান, যেন নীরবতা ভেঙে অবরুদ্ধ গাজার জনগণের পাশে দাঁড়ায়।

এক নজরে গাজার ভয়াবহতা
৬১,৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত (গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত)
বহু মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে-প্রকৃত সংখ্যা আরও ভয়াবহ
জাতিসংঘের মতে, গাজা এখন আবারও 'চরম খাদ্য সংকট' ও 'স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পতন' এর মুখোমুখি

শেষ কথা: ‘মানবতা জেগে উঠুক’
আন্তর্জাতিক আদালতের মঞ্চে কাতারের কণ্ঠে যেন বিশ্ব বিবেকের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। এখন প্রশ্ন-এই অভিযোগ কি কেবল আদালতের নথিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি এটি হবে একটি নতুন মোড়, যেখানে বিশ্ব নতুন করে গাজার জনগণের পাশে দাঁড়াবে?


এ জাতীয় আরো খবর