শেষ বয়সে কোনো উপায় না দেখে কলকাতার পার্ক স্ট্রীটের রাস্তায় ক্রসিংয়ে কাপড়ে অনেকটা মুখ ঢেকে ভিক্ষে করতেন সাধনা বসু।
'প্লিজ গিভ মি সাম মানি, পুওর লেডি স্যার প্লিজ' বলে ভিক্ষে করতেন চল্লিশের দশকের নায়িকা। সেখানেও ভিখারীদের তাড়া খেয়ে এদিক সেদিক ঘুরে ভিক্ষে করে দিন কাটাতে হতো এই অভিনেত্রিকে।
ভাগ্য কাকে, কখন, কোথায় নিয়ে যায় তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ এই প্রবাদপ্রতিম নায়িকা!!
ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা কেশব চন্দ্র সেনের দৌহিত্রী সাধনার জন্ম হয়েছিল ২০ এপ্রিল ১৯১৪ সালে।
বাবা সরল চন্দ্র সেন ছিলেন বিখ্যাত ব্যারিস্টার। রূপবান এই কন্যার ছোট থেকেই নাচের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। পায়ে ঘুঙুর বেঁধে ছোট্ট সাধনার নাচ দেখতেন সবাই মুগ্ধ হয়ে।
নৃত্য গুরু বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে সাধনা বসু অনেক মঞ্চ সফল অনুষ্ঠান করেছেন।যেমন 'ভুলে না যাই' 'দুর্ভিক্ষ' প্রভৃতি।
সাধনার সিনেমার ক্যারিয়ার শুরু হয় মাত্র ১৬ বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কাহিনীকে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া ছবি 'ডালিয়া'র মাধ্যমে। ১৯৩০ সালে তৈরি সেই ছায়াছবির পরিচালক ছিলেন মধু বসু স্বয়ং, যিনি পরবর্তীতে সাধনা বসুকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন।
সাধনা বসুর সমগ্র ভারত জুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ১৯৩৪ সালে ভারত লক্ষ্মী পিকচারের ছবি 'আলি বাবা' তে মর্জিনা চরিত্রে অভিনয় করে। পরে এই একই চরিত্রে অভিনয় করেন 'আব্দুল্লাহ' নামের একটি ছবিতে।
এই ছবিতে তাঁর অভিনীত একটি দৃশ্যের গান 'ছি ছি এত্তা জঞ্জাল' এত অসম্ভব জনপ্রিয় হয় যে গানটি সে সময় সকলের মুখে মুখে ফিরত। আজও এই গানের কথা ও লাইন শোনেন নি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।
এরপর একের পর এক ছবির অফার আসতে থাকে সাধনার কাছে। একে একে বিদ্যুৎ পর্ণা, রাজনটী, মীনাক্ষী, শঙ্কর পার্বতী, কুমকুম, পয়গাম, ফর লেডিজ অনলি, মা ও ছেলে, ইত্যাদি। টাকা খ্যাতি জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে সাধনার।
মঞ্চ ও চলচ্চিত্র, উভয় মাধ্যমেই সাধনা বসুর প্রধান পরিচয় নর্তকী হিসেবে। শৈশবকাল থেকে নাচ শিখেছেন গুরু তারানাথ বাগচী (কত্থক), সেনারিক রাজকুমার (মণিপুরী) ইত্যাদিদের থেকে। গান-বাজনা শিখেছেন ওস্তাদ ইনায়েত খাঁ, তিমির বরণ এবং শচীন দেব বর্মণের কাছে। পিয়ানো শিখেছেন ফ্রাংকো পোলোর কাছে।
নবজাগ্রত ধ্রুপদী নাচগুলির বিভিন্ন শৈলীগুলিকে একত্রিত করে ব্যালের অনুপ্রেরণায় তিনি যে আধুনিক ডান্স ফর্মের জন্ম দেন তার অসামান্য উদাহরণ- ভুখ, ওমর খৈয়াম ইত্যাদি নাটিকা।
বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত সমাজে নাচকে একটি সম্মাননীয় আর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সাধনা বসুর অবদান অনস্বীকার্য।
'আলিবাবা' ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্যের পরে মধু বসু-সাধনা বসু জুটি একাধিক সফল বাংলা ও দ্বিভাষিক (বাংলা ও হিন্দি) ছবি উপহার দেন। এ সব ছবির মধ্যে অভিনয়, কুমকুম ও রাজনর্তকী বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
'রাজনর্তকী' ছবিটির একটি ইংরেজি সংস্করণ 'দা কোর্ট ড্যান্সার' নামে মুক্তি পায়। সাধনা বসু অভিনীত শেষ ছবি 'বিক্রমোর্বশী' মুক্তি পায় ১৯৫৪ সালে।
তাঁর ছবি 'রাজ নর্তকী' বহু ব্যয়ে তৈরি হলেও এই ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই সময় থেকেই একটু একটু করে পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে শুরু হয় তাঁর। একসময় বিজ্ঞাপনের মূল ফেস হিসেবে যাঁর ছবি ব্যবহার করা হতো সেই বিজ্ঞাপনের অফারও কমতে শুরু করে।
বলা হয়, ধীরে ধীরে.. দুঃসময় যখন আসে সে একা আসে না..
চারিপাশের স্তাবক দল, মদের ফোয়ারা, বল্গাহীন জীবন যাপন সাধনা বসু এবং মধু বসুকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
একটা সময় থেকে নেমে আসে প্রবল দারিদ্র্য। ছোট খাটো নাচের অনুষ্ঠান, নাটক মঞ্চস্থ করে কোনোরকমে টাকার জোগাড় হতো।
মাঝে যে স্বামীর জন্য সাধনা বসু 'নায়িকা' হয়েছিলেন বোহেমিয়ান জীবন বেছে নিয়ে সেই স্বামীকেও ছেড়ে চলে যান সাধনা বসু। পরে অবশ্য ফিরে আসেন স্বামীর কাছে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।
নিঃসঙ্গতা আর অসীম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মারা যান মধু বসু। একসময়ের ডাকসাইটে পরিচালক ও প্রযোজক - অথৈ জলে পড়েন সাধনা বসু। শেষ বয়সে কোনো উপায় না দেখে পার্ক স্ট্রীটের রাস্তায় ক্রসিংয়ে কাপড়ে অনেকটা মুখ ঢেকে ভিক্ষে করতেন তিনি।
'প্লিজ গিভ মি সাম মানি, পুওর লেডি স্যার প্লিজ' বলে ভিক্ষে করতেন চল্লিশের দশকের নায়িকা।
অভিনীত চলচ্চিত্রসমুহ - আলিবাবা, অভিনয়, রাজনর্তকী, কুমকুম, মীনাক্ষী, পয়গাম, শঙ্কর পার্বতী, বিষকন্যা, নিলম, ভোলা, শঙ্কর, ফর লেডিজ ওনলি, নন্দ কিশোর, শিন শিনাকি বুবলা বু, শেষের কবিতা, মা ও ছেলে, বিক্রমোর্বশী।
অবশেষে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে ৩ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন কিংবদন্তি সাধনা সেন বসু।
তথ্যসূত্রঃ 'অনুশীলন'