সোমবার, মে ২৫, ২০২৬

আমি সুচিত্রা সেন বলছি

  • (সৌজন্যে) মেসবা খান
  • ২০২৫-০৪-০৭ ১৪:৫০:০৬
ফাইল ছবি

আমি একরোখা ধরনের মানুষ। কখনো কাউকে সাহায্য করতে বলি না। 'ভগবান শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য’তে অভিনয় আমার জীবন বদলে দিয়েছে।

আমি সেখানে বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রে ছিলাম। তার পর থেকেই আমি নির্ভয়। কেউ একজন এর মধ্য দিয়েই আমাকে চালিত করেছে। আমি শুধু আমার নিজের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করি।

অবসরের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অভিনয়ের একটা প্রস্তাবও আমি গ্রহণ করিনি। সকালটা কাটাই আকাশ, গাছ, বাগানের ফুল এসব দেখে। বিকেলে দেখি গোধূলীর আকাশ। আর নাতনিরা যখন আসে তখন তাদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।

আমার খুব ইচ্ছা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুরঙ্গ’র দামিনি চরিত্রে অভিনয় করি। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। প্রেমেন্দ্র মিত্র একটা সিনেমার পরিকল্পনা করেছিলেন। কাজটা আমিই করতাম। কিন্তু প্রযোজক হেমেন গাঙ্গুলি হঠাৎ আত্মহত্যা করে বসলেন। আমার আর সিনেমাটা করা হয়নি। এমনকি দামিনি চরিত্রটা আমি থিয়েটারে হলেও করতে চেয়েছিলাম। উপন্যাসটার উপর আমার সত্যিই বিশাল ভালো লাগা কাজ করে। ঠাকুরের সব কাজের মধ্যে এটা আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।

অগ্নিপরীক্ষা, হারানো সুর, উত্তর ফাল্গুনী, সপ্তপদী সিনেমাগুলোতে উত্তমের বিপরীতে কাজ আমার অনেক পছন্দের। আর সৌমিত্র চ্যাটার্জির সাথে সাত পাকে বাঁধা।

মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সাত পাকে বাঁধা’র জন্য সেরা অভিনেত্রির পুরস্কার পেয়েছিলাম আমি। তবে এই কাজটার কথা বেশি মনে পড়ে অন্য একটা কারণে। এই সিনেমায় যেটা আপনারা ঘটতে দেখেছেন, সেটা আমার বাস্তব জীবনেও ঘটেছে।

শুটিংয়ের সময় প্রতিদিন আমার স্বামীর সাথে ঝগড়া হতো। একদিন সকালে বাসায় আমার স্বামীর শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। বিকেলে ঠিক একই ধরনের একটি ঝগড়ার দৃশ্য শুটিং হলো। আমি পরিচালককে বললাম, আমি সৌমিত্র চ্যাটার্জি’র পাঞ্জাবি ছিঁড়তে চাই। তিনি রাজি হলেন।

অনেকগুলো সিনেমায় উত্তম কুমারের সাথে আমি জুটি বেঁধেছি। আমি সব প্রযোজককেই বলতাম, সিনেমার পোস্টারে উত্তমের নামের আগে যেন আমার নাম রাখা হয়।

উত্তমের সাথে আমার ভালো একটা বন্ধুত্ব ছিল। অভিনেতাদের মধ্যে আমি দিলীপ কুমারকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি।

১৯৫০ দশকের মাঝামাঝিতে বিমল রায় আমাকে মুম্বাইতে নিয়ে যান। সেখানে দিলীপের বিপরীতে দেবদাস’এ কাজ করেছি। একজন বিরাট অভিনেতা!

এছাড়া সঞ্জীব কুমারের মত দারুণ একজন মানুষের সাথেও আমার বন্ধুত্ব হয়। তিনি একজন ভালো অভিনেতাও ছিলেন। কলকাতায় যতবার আসতেন, ততবারই আমার সাথে যোগাযোগ করতেন। আমার বাসায় আসতেন।

আমি কানন দেবী’রও কাছের ছিলাম। তিনি আমার খারাপ সময়ে সহযোগিতা করেছেন। সংসারে বিরোধ চলার সময় আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তখন তার কাছেই কিছু সময় কাটিয়েছিলাম।

পুরুষের মধ্যে আমি সৌন্দর্য্য দেখি না। আমি দেখি তাদের বুদ্ধিমত্তা আর স্পষ্ট বাক্যালাপ।

আমি রাজ কাপুরের অফার সাথে সাথেই প্রত্যাখ্যান করেছি। তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র নিয়ে। আমি সোফায় বসা ছিলাম। হঠাৎ করে তিনি আমার পায়ের কাছে এগিয়ে এসে একটা ফুলের তোড়া দিতে দিতে অভিনয়ের অফার দিলেন। আমি অফার প্রত্যাখ্যান করলাম।

তার ব্যক্তিত্ব আমার পছন্দ হয়নি। যেভাবে তিনি আমার পায়ের কাছে এগিয়ে এসে আচরণ করলেন, সেটা একজন পুরুষের সাথে মানায় না।

আর সত্যজিত রায়ের কাজ ছেড়েছি ভিন্ন একটা কারণে। তিনি চেয়েছিলেন তার দেবী চৌধুরানী’তে একদম আলাদা সময় নিয়ে যেন কাজ করি।

কিন্তু ওই সময় আমার আরো দুটি কাজ হাতে ছিল। যারা আমাকে সুচিত্রা সেন বানিয়েছে তাদেরতো ফিরিয়ে দিতে পারি না। আমি তাকে বললাম, আমি আমার সেরাটা দেব আপনার ফিল্মে। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। তাই আমিও তাকে না বলে দিলাম।

কেন আমি এরকম প্রস্তাবে রাজি হবো?

একবার কানন দেবী’র স্বামী হরিদাশ ভট্রাচার্য’র সিনেমার শুটিং করছি। আমি তাকে একটা দৃশ্যের জন্য বললাম যে, আমি এভাবে কাজ করতে চাই।

কিন্তু তিনি জানালেন তার চাওয়া মতো করে আমাকে কাজ করতে হবে। এ নিয়ে আমাদের বড় তর্ক শুরু হলো। আমি শুটিং ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। কাজ থেমে গেল। তার অনেক দিন পর ভট্রাচার্য আমার কথামতো রাজি হলেন। তারপরই কাজটি শেষ করেছি।

স্রষ্টা আমাকে সবই দিয়েছেন যতটা আমি চাইনি। আর যা চেয়েছি তাও দিয়েছেন। কিন্তু এখন, কোনকিছু আমার ভালো লাগে না। পছন্দ-অপছন্দ, পাওয়া-না পাওয়া বিষয়ে আমি একদমই ভিন্ন ধরনের।

মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে কী লেখা হলো, আলোচনা করা হলো এ নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। এগুলো আমি পড়িও না।

মানুষ আমাকে নিয়ে কী বলে এ নিয়েও সম্পূর্ণই ভিন্ন প্রকৃতির। বেলুর মঠের ভারত মহারাজ আর গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের কানাই মহারাজের কাছে যাই আমি। তবে ভারত মহারাজের মৃত্যুর পর বেলুর মঠে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

আমি এতটাই নিংসঙ্গপ্রিয় যে, আমার ছোটবোন রুনার বিয়েতেও যাইনি। আমি যদি কোথাও ঘুরতে যেতাম, তবে পাহাড় আমার পছন্দ।  

সংকলিত।


এ জাতীয় আরো খবর