মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৩, ২০২৬

অ না মি কা

  • চৈত্রঅবসান
  • ২০২৫-০৪-০১ ১৭:১১:৫৭

এক এক দিন চিরপরিচিত সংসার যেন চারিদিক থেকে আবদ্ধ করে ফেলে, প্রাণ প্রায় হাঁপিয়ে ওঠে। সে সময় সংসারের সমস্ত ব্যস্ততা থেকে স্বতন্ত্র হয়ে উদাস মন যেন অতিচেতন হয়ে ওঠে। জানলার বাইরের বাগানের শুকনো পাতার খসখস শব্দ,  কোকিলের হৃদয়বিদারক তীক্ষ্ণ কূজন, পুকুরপাড়ের রাস্তায় গাড়ির তীব্র নিনাদ মনকে অকারণে বড্ড অস্থির করে তোলে।
কোন কাজ করতে সেদিন মন চায়না, অহেতুক কথার বাদ-প্রতিবাদ ভালো লাগে না, নিজেকে ব্যস্ত করতে ইচ্ছে করেনা। শুধু জানলার ধারে বসে দিগন্ত থেকে ভেসে আসা বাঁশির মেঠো সুর শুনতে ইচ্ছে করে চুপটি করে।
আজ ছিল তেমনি এক মন কেমনের দিন। শেষ বসন্তের ঝিম ধরা ঠান্ডা হাওয়া যেন কানে কানে কোন্ এক বিদায় গাথা শুনিয়ে যায়-----বোধগম্য হয় না।
সম্বিত ফেরে চৈত্রের নরম আলতো স্পর্শে। কম্পিত কৃষ্ণচূড়ার শাখার মধ্য দিয়ে আসা রৌদ্রছায়ার অবগুন্ঠন সরিয়ে সে জিজ্ঞেস করে কি ভাবছো? তার দৃষ্টিতে বৈরাগ্য, কন্ঠে ঔদাস্য, মনের রং তসর রঙের মতো ধূসর। 
নিস্পৃহ স্বরে আমি বলি, অবসান তো আসন্ন! সে হেসে বলে--- জীবনের অর্থই তো তাই! শুরু থাকলেই শেষ থাকবে। আদি থাকলেই অন্ত থাকবে।  এটা তো জীবনের অমোঘ সত্য----  এতে মন খারাপ করলে চলবে কেন?
আমি বলি,  চলে গেলে তো জলস্রোতের ধারার মতো জীবনের বিচিত্র প্রবাহ আর দেখতে পাবে না! ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছার, এক এর সঙ্গে দশের, সাধনার সঙ্গে স্বভাবের, কামনার সঙ্গে ঘটনার আবর্তন তো আর দেখতে পাবে না।
সে বলে, আমার পরে যে আসবে সে দেখবে। 'তার পরে'র সঙ্গে 'তার পরে'র বুনোনেই তো অস্তিত্বের ইতিহাস রচে।
আমি অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বলি, তুমি চলে গেলে জগত তপ্ত হবে, আদিম বাষ্প আকাশ ছেয়ে ফেলবে, তোমার রঙের সঙ্গে, ধ্বনির সঙ্গে, গন্ধের সঙ্গে আমাদের রক্তিম বোঝাপড়া শেষ হবে। উষ্ণতায় শুষ্কতায় নিঃসৃত হবে দীর্ঘশ্বাস।
সে হেসে বলে----সে কথা ঠিক, কিন্তু পুরাতনের বিসর্জনেই যে নূতনের আবাহন, আমি না গেলে সে নূতন আসবে কি করে?
আমি সে তপস্বিনী, নিরাভরণ চৈত্রের কাছে হার স্বীকার করে বলি, তোমার বিচিত্র তান এক হয়ে মিশে যাক মৌনমন্ত্রে, ধ্যানের শান্তিতে। গন্ধবিধূর ধুপের মতো,  সেতারের সুরের অনুরণনের মতো, মেঘের বুকে আলোর মতো তোমার মহিমা নিঃশেষে হোক লীন।
তুমি যাও--- 'চৈত্র'---ছুটি দিলাম এবারের মত, কিন্তু ফিরে এসো আবার বৎসরান্তে---- তখন না হয় আরো একবার  তোমার লালিমালিপ্ত হৃদয় নিয়ে নতুন করে মহোৎসবের কাব্য লিখব। ততক্ষণ আনন্দের সাথে আনন্দ হয়ে থেকো আনন্দলোকে।
 


এ জাতীয় আরো খবর