ড. আহমেদ শরীফ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে অগাধ জ্ঞানের কারণে সমাদৃত হয়েছেন দেশ-বিদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ৩৬ বছরের ছাত্র-শিক্ষকতা জীবনে নিজের আসনটা রেখে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
একালের অনেক জ্ঞানতাপসের শিক্ষক ও অনুপ্রেরণার উৎসও ছিলেন ড. আহমদ শরীফ।
তাঁর ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ (প্রথম খণ্ড ১৯৭৮, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৮৩) আদি ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক টুকরো তুলনাহীন রত্ন হয়ে আছে এখনো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও সহকর্মী হিসেবে ড. আহমদ শরীফকে পেয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। শিক্ষকের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বারবার উঠে এসেছে ড. শরীফের শিক্ষকতার কথা, তাঁর পড়ানোর স্টাইল ও প্রতিবাদী সত্তার ছটা। ড. শরীফের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করাটা কতটা তাৎপর্যমণ্ডিত ছিল, সেটার নমুনা মিলবে ওই সাক্ষাৎকারে।
ড. আজাদ লিখেছেন, “তিনি ক্লাসে ঢোকার সাথে সাথেই জ্যৈষ্ঠের ঝড় বয়ে গিয়েছিল আমাদের মধ্যে। চেয়ারে বসে তিনি নাম ডাকেন, তারপর এদিকে-সেদিকে পায়চারি করতে করতে কলা ভবনকে থরথর ক’রে কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেন।
পাঠ্যপুস্তককে পেরিয়ে যান কয়েক মুহূর্তে। আবার যখন ফিরে আসেন দৌলত উজির বাহরাম খান বা আলাওল বা বড়ু চণ্ডীদাসের কালে, ‘তখন আমরা সভ্যতা ও ইতিহাসের বড়ো বড়ো যুগ তাঁর সাথে যাপন ক’রে এসেছি। এর মাঝে তিরস্কৃত হয়েছেন অনেক প্রাতঃস্মরণীয়, বাতিল হয়ে গেছেন বহু মহাপুরুষ, বন্যায় ভেসে গেছে অনেক সংস্কার, ভাঙা কুঁড়েঘরের মতো নড়োবড়ো হয়ে পড়েছে বহু ভারী বিশ্বাস। খুব গুছিয়ে, সুবিন্যস্ত শব্দে ও বাক্যে, অভাবিত শব্দ প্রয়োগ ক’রে কথা বলেন না তিনি। কথা বলেন অনর্গল স্রোতে, মাঝে মাঝে বিশেষ বিশেষ শব্দের ওপর জোর দিয়ে ও টেনে। পদচারণা করতে করতে বক্তৃতা দিতেন; মাঝে মাঝে থেমে একটা বেশ ভীতিকর ধমক দিতেন, তাতে কেঁপে উঠতো ক্লাসের ও বাইরের বহু কিছু। বুঝে ফেলেছিলাম অধ্যাপক আহমদ শরীফ কোনো সবাক পাঠ্যপুস্তক নন।”
১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে জন্ম ড. আহমদ শরীফের।
বিখ্যাত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তাঁর চাচা। বেড়ে উঠেছিলেন সাহিত্যবিশারদের সংগৃহীত একরাশ পুঁথি ও সাহিত্য সাময়িকীর মধ্যে।
১৯৪০ সালে আইএ এবং ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর এমএতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখানে পেয়ে যান প্রিয় শিক্ষক মোহিতলাল মজুমদারকে। তাঁর আরেক প্রিয় শিক্ষক ছিলেন গণেশচরণ বসু।
এমএ পাস করার পর প্রথমে দুর্নীতি দমন বিভাগে চাকরি নিলেও ওই বিভাগের দুর্নীতি দেখে ১৯৪৫ সালে চাকরি ছেড়ে যোগ দেন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার নওয়াব ফয়জুন্নেসা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে।
এরপর ১৯৪৮ সালে ফেনী কলেজে। এক বছরও থাকেননি সেখানে। ১৯৪৯-এর জুনে রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।
প্রতিবাদী স্বভাবের কারণে সেখানেও বেশিদিন টিকতে পারেননি। ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে গবেষণা সহকারি হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এসেছিলেন বিপুল স্বর্ণসম্ভার নিয়ে, সেগুলোর রক্ষী হয়ে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন ৫৯৭টি পুঁথি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁথিগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করার সময় আহমদ শরীফকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন আবদুল করিম। পুঁথিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ভারও পড়ে ওই পুঁথিগুলোর সঙ্গে আবাল্য যিনি সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সেই আহমদ শরীফের ওপর।
৩৪ বছর তথা ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে সামলে চলতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ। পালন করেছেন সভাপতি ও ডিন হিসেবে নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব। তথাপি তার উপাচার্য না হতে পারাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমোচনীয় কলঙ্ক বলেই উল্লেখ করেছেন হুমায়ুন আজাদ।
সবশেষে ১৯৮৪ সালে ড. আহমদ শরীফ যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল অধ্যাপক পদে।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে এই পন্ডিত ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ ঘটে। শ্রদ্ধাঞ্জলি।