বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬

কারবালা: শোকের ইতিহাস নয়,ন্যায়ের চিরন্তন আহ্বান

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৬-২৫ ১২:১৬:৩৯
প্রতীকী ছবি

মহররম মাস এলেই মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে ফিরে আসে কারবালার স্মৃতি। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররমে সংঘটিত সেই মর্মন্তুদ ঘটনা শুধু একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি সত্য, ন্যায়, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যা যুগে যুগে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস যুগিয়েছে।
কারবালার ঘটনা বুঝতে হলে এটিকে কেবল আবেগের নয়, আদর্শের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ইমাম হোসাইন (রা.) ক্ষমতা বা রাজত্বের জন্য সংগ্রাম করেননি। তিনি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে অন্যায়ের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ সত্যকে বিপন্ন করে তুলছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যদি নৈতিকতা ও দ্বীনের মৌলিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেওয়া হয়, তবে সমাজে জুলুম ও অবিচারই প্রতিষ্ঠিত হবে।
কারবালার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-সত্যের পথে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া জরুরি নয়, দৃঢ় থাকা জরুরি। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গী ছিলেন অল্প কয়েকজন, কিন্তু তাদের ঈমান, ধৈর্য ও আনুগত্য ছিল পাহাড়সম দৃঢ়। তারা জানতেন, সামনে মৃত্যু অপেক্ষা করছে; তবুও তারা আদর্শের পথ থেকে সরে যাননি। এ শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। আশুরার গুরুত্ব কারবালার ঘটনার বহু পূর্ব থেকেই ইসলামে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা পালন করেছেন এবং উম্মতকে তা পালনের উৎসাহ দিয়েছেন। আশুরার ফজিলত মূলত আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কারবালার ঘটনা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক ও শিক্ষণীয়, কিন্তু আশুরার ধর্মীয় বিধান তার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আজকের মুসলিম সমাজের জন্য কারবালার শিক্ষা হলো আত্মসমালোচনা, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণ। কারবালা আমাদের শেখায়, ক্ষমতা নয়-সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। তলোয়ার হয়তো শরীরকে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু আদর্শকে নয়।
দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেক সময় কারবালার প্রকৃত শিক্ষাকে ভুলে গিয়ে কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি। অথচ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর জীবন আমাদের আহ্বান জানায় আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, মানবতা ও আল্লাহভীতির পথে ফিরে আসতে। তিনি শিখিয়েছেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা ঈমানদারের কাজ নয়; আবার প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও ইসলামের নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না।
বর্তমান বিশ্বে যখন অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার নানা রূপে দেখা যাচ্ছে, তখন কারবালার শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হোসাইনি আদর্শের পুনর্জাগরণ।
কারবালা তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি মানবতার বিবেকের কাছে এক চিরন্তন প্রশ্ন-সত্য ও মিথ্যার সংঘাতে আমরা কোন পক্ষ বেছে নেব?

লেখকঃ কলামিস্ট, সোস্যাল এক্টিভিস্ট। 


এ জাতীয় আরো খবর