আমার কাজিন সিস্টার, মানে মামাতো বোন আলো আপার চোর খ্যাতি আছে। আপার বয়স কম হয় নাই; ষাট ছুঁই ছুঁই; দুই মেয়ে, এক ছেলের মা; অথচ মাতুলালয়ের সবাই আজো তাকে এই অপবাদ দেয়। ইদানিং শুনতেছি, মায়ের নিন্দা শুনতে শুনতে ছেলে অতিষ্ট হয়ে বিদেশে চলে গেছে। মেয়েরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তুমি যেন আমার শশুর পক্ষের কারো বাসায় না ঢোকো; আল্লার কিরা লাগে…।
অথচ আলো আপা নির্বিকার! কিশোরী বয়স থেকে পাড়া, গ্রাম, শহর সর্বত্র এর-ওর বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। আপার যেমন রূপ, তেমন গুন—যেকারো বিপদ-আপদে সবার আগে দেখা যায়। হাসপাতালে আলো আপা; মরার ঘরে সাদা শাড়ি পরে কোরান পড়তে আলো আপাকেই দেখা যাবে।
ভার্সিটিতে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্রি ছিলো; কিন্তু চাকরি-বাকরি কিছুই করে নাই। বান্ধবীদের পাত্তা দেয় না; বন্ধু বেসুমার। মামা, চাচা, খালু, ফুপা—বড়দের সবাই বলে—ও যে চুরি করে তোরা কেউ দেখছস?
না; শুনছি।
এইতো! তোরা অরে হুদাই দোষ দেস; অর মতো মাইয়া গুষ্ঠিতে একটাও আছে, ক দেখি?
আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন অফিসার্স ক্লাবে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রথম আলো আপার বদনাম শুনি। আপা গিফট কাউন্টারে বসে উপহার নিচ্ছিলো; আর পাশে জটলা বেঁধে মহিলা-মহল ফিসফিস করে বলতেছিলো—কাম সারছে! এরে কে বসাইছে?
কনের বাবায় বসাইছে।
ও; তাইলেতো আর কিছু বলার নাই; দেইখো, একটা টাকাও পাইবো না; সব বেগে ঢুকাইয়া পাল্টি দিবো।
সত্যি তাই ঘটে। গিফটের নগদ টাকাগুলো নিয়ে অনুষ্ঠান থেকে হাওয়া হয়ে যায় তো যায়, কয়েক বছরেও ওই পরিবারটার কাছে ঘেষে না। আবার ওই বাসায় যায়, যখন চাচীর মৃত্যুর খবর পায়। মরার ঘরে কেউ কি এতো পুরানো চুরির ঘটনা উঠাবে! বোন আমাদের এতোই চতুর।
একবার খুব চাঞ্চল্যকর সংবাদ আমাদের ভাই-বোন মহলে ভাইরাল হয়ে যায়; সবাই বলাবলি করতে থাকে—আলো আপা নাকি জগলুর বউ’র কানের আর গলার সোনা ঘুমের মধ্যে খুইলা নিয়া গেছে; নতুন বউটা ঘুনাক্ষরেও টের পায় নাই!
এমন হাজারো কিচ্ছা ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে আপাটাকে যথা সম্ভব সমঝে চলি। কিন্তু বোন আমার ভিষণ দরদীও বটে। মিথিলাকে বিয়ে করার সমায় সাক্ষি কোথায় পাই! তখন আলো আপাকেই মনে পড়ে। আপার একটাই কথা—একদম চিন্তা করবি না; আমিতো আইসা পড়ছি। আম্মা তখন চিটাগাং; খরচ-পাতি সব আপাই করে। আপা হেসে বলে—কামাই-রুজি কইরা ফেরৎ দিয়া দিস।
বিয়ের পরপর মিথিলার এপেন্ডিসের ব্যথা উঠলে রাতদুপুরে দেখি, আলো আপা হলিফ্যামিলি হাসপাতালে এসে হাজির।
তুমি কার কাছে খবর পাইলা?
আপা হাসে—আর চিন্তা করিস না; যা, ফার্মেসি থেকে এই ঔষধগুলা নিয়া আয়; টাকা আছে?
সেই থেকে মিথিলা আলো আপার ভক্ত। কারণে অকারণে আপার সঙ্গে খুব কথা বলে। কিন্তু আপামনি বছরখানেকের মধ্যেও আমাদের বাসায় চরণধুলি ফেলার সময় পায় না। মিথিলাকে বলি—এতোযে ফোনে পিরিত করো; বাসায় আসলে চোখ-কান খোলা রাখবা।
মিথিলা রেগে যায়—কিযে বলো না! আপা ফেরেস্তার মতো মানুষ; এখনো কি মিষ্টি দেখতে; কি স্মার্ট। আপাকে নিয়া কুটনামী করবা না, বলে দিচ্ছি।
আমার কি দোষ! সবাইতো আপার ভয়ে টানটান।
একদিন হঠাৎ আপার ফোন পাই; আনকমন টাইমে; সকাল সাতটায়। আমি চমকে যাই—এই মিথিলা, ওঠো; আপা ফোন করছে।
কোন আপা?
আরে, আলো আপা।
মিথিলা হুড়মুড় করে জেগে উঠে ঘর গুছাতে ব্যস্ত হয়ে যায়—তুমি নিচে গিয়ে রুটি আর জেলি নিয়ে আসো; যাও!
আলো আপা আসাতে দুজনেই খুব খুশি হই। প্রথমবার এসেই দারুন একটা আলুভাজি করে তাক লাগিয়ে দেয়। আমি বাজারে গিয়ে পাকিস্তানি কক আর বাতাসি মাছ নিয়ে আসি।
আপা বলে—আজকে থাকবো, মিথিলা; দেখবো, তুমি আমার ভাইটারে ফাঁসাইয়া কেমন সংসার পাতছো।
মিথিলা বলে—শাড়ি পাল্টে এই কাপ্তানটা পরে নেন।
আলো আপা শাড়ি পাল্টায় না। ফোনে কার সঙ্গে যেনো একটু পরপর কথা বলে। আমি আর মিথিলা রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। এর মধ্যে আপা এসে বলে—চা করো; চা খেয়ে বেরিয়ে যাবো।
কেনো! এই না বললেন থাকবেন। অন্তত আমাদের সাথে লাঞ্চ করে যান।
কিন্তু হঠাৎ আপা হাবভাব বদলে ফেলে বলে—না; আরেকদিন এসে থাকবো; আজকে পারতেছি না; স্যরি মিথিলা; তোমরাতো জানো আমার পায়ে চাক্কা লাগানো আছে।
নিচে নেমে আপাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে বাসায় ফিরলে মিথিলা ব্যকুল হয়ে জানতে চায়—আপা চলে গেছে?
হ্যাঁ; কেনো?
না, মানে, আমার সোনার চেইনটা পাচ্ছি না।
পাচ্ছি ন মানে! কোথায় ছিলো?
এইতো, ড্রেসিং টেবিলের উপর। রাতে এসে খুলে এখানে রেখে দিছিলাম।
ভালো করে খুঁজেছো?
তন্ন তন্ন করেইতো খুঁজলাম। আপা নিয়ে গেলো না তো? তোমরা যে বলো, আপার ক্লেপ্টোমেনিয়া আছে।
এতো বছর পর বুঝে ফেলি, কেনো সবাই ওনার সম্পর্কে এতো কথা বলে। মিথিলা খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে সিগারেট ধরায়। আমি বলি—থাক; আপার বয়স হইছে; তোমাকে আরেকটা চাইন কিনে দেবো নে।
আমরা হেসে ফেলি; দুজনে একসাথে বলে উঠি—আলো আপা একটা চিজ বটে।