সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন কার্যকর আইন, জবাবদিহি ও সমন্বিত উদ্যোগ
সড়কে প্রতিদিন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, পরিবার হারাচ্ছে তাদের প্রিয়জন। কেউ হারাচ্ছেন উপার্জনক্ষম স্বামী বা স্ত্রী, কোনো শিশু হারাচ্ছে তার বাবা-মাকে, আবার কোনো পরিবারকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা। সড়ক দুর্ঘটনার এই মানবিক ও সামাজিক মূল্য শুধু পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিরাপদ সড়কব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) Global Status Report on Road Safety 2023 অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সে বছর প্রতি লাখ জনসংখ্যায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ছিল ১৮.৬। এই সংখ্যা WHO-এর মডেলভিত্তিক অনুমান; এটি সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা নয়। তবে এ পরিসংখ্যান সড়ক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান। সরকারও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশও অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি এ ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক।
সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা এবং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এসব অঙ্গীকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। কারণ সড়ক নিরাপত্তায় সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কতটা কমছে এবং মানুষের নিরাপদ চলাচল কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তার ভিত্তিতে।
কেন নতুন সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রয়োজন
সড়ক নিরাপত্তার সমস্যা কোনো একক সংস্থা বা ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, সমন্বয় ও জবাবদিহি স্পষ্ট না হলে উদ্যোগের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি তাই এমন একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো প্রয়োজন, যা সড়ক নিরাপত্তার সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে একই নীতির আওতায় আনবে। নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ গতি, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট দায়িত্ব, বাস্তবায়নব্যবস্থা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘Government’s Commitment to Improve Road Safety in Bangladesh’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের সরকারি অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারের এই অঙ্গীকার এবং সড়ক নিরাপত্তার অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতিকে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া।
নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথা হলো, মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে অনুযায়ী পুরো সড়কব্যবস্থাকে নিরাপদ করে তুলতে হবে। এ জন্য শুধু চালকের আচরণের ওপর নির্ভর না করে সড়কের নকশা, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতিসীমা, আইন প্রয়োগ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
নতুন আইনে পাঁচটি অগ্রাধিকার
প্রথমত, নিরাপদ গতি নিশ্চিত করা। অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনা ঘটলে আঘাতের তীব্রতা বাড়ায়। সড়কের ধরন, আশপাশের পরিবেশ ও পথচারীর উপস্থিতি বিবেচনায় উপযুক্ত গতিসীমা নির্ধারণ এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং বেপরোয়া চালনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করা। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত প্রাণহানি ও গুরুতর অক্ষমতার অন্যতম কারণ। তাই চালক ও সহযাত্রীর মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি হেলমেটের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধ, চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স প্রদানব্যবস্থার মান উন্নত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সড়কের নকশা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। ফুটপাত, নিরাপদ পথচারী পারাপার, পর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন, আলোকসজ্জা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গতিনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
চতুর্থত, দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। মহাসড়কে অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারসেবার প্রাপ্যতা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং কাছাকাছি হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুললে চিকিৎসায় বিলম্ব কমানো এবং আরও অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।
পঞ্চমত, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। WHO-এর অনুমান এবং দেশের সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য বুঝতে এবং কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জরুরি। তাই একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা-তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা, নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন
নতুন আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। আইন কার্যকর করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়নের পর প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকা তৈরিতে অযথা বিলম্ব করা যাবে না। একই সঙ্গে আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন সময়ের মধ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কোন সংস্থা তার দায়িত্ব পালন করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে পরিমাপ করা হবে—এসব বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। দুর্ঘটনার তথ্য, আইন প্রয়োগের অগ্রগতি এবং প্রাণহানি কমানোর ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, গবেষক, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, উন্নয়ন সহযোগী এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করলে আইনটি আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে।
সড়ক নিরাপত্তা কোনো বিশেষ দিবস বা সাময়িক প্রচারাভিযানের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন রক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। তাই সরকারের প্রতি প্রত্যাশা, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে এবং আইনটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের অঙ্গীকার আশাব্যঞ্জক। এসব অঙ্গীকারের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমার মধ্য দিয়ে। নতুন আইনটি যেন কেবল একটি আইনি দলিল হয়ে না থাকে; বরং মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সড়কে প্রতিটি প্রাণ মূল্যবান। সেই প্রাণ রক্ষায় এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার ধারাবাহিকতা, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহি। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব—যদি অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত হয় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
তামান্না মিজান, রোড সেফটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক।