বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬

ম ক্কা ম দি না না মা

  • সালেহ আহমদ
  • ২০২৩-০৯-২৬ ২২:৫৭:৫৩

মদিনায়, মসজিদে নববীতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে ভালো লাগে।রাসুলের রওজার কাছে প্রথম সারিতে একটু সংগ্রাম করে দাঁড়িয়ে যেতে সক্ষম হই।ফজরের নামাজের অনেক দেরি।বসে বসে হাতের কড়ুই গুনে আল্লাহর নাম জপি।পর্দার ওপারেই তিনজনের কবর।আমাদের শেষ নবি হযরত মোহাম্ম(সাঃ),হযরত আবু বাকার আর হযরত ওমরের।
ওপরে ছাদের দিকে চোখ গেলে লক্ষ্য করি হাজার বছরের পুরনো মসজিদের অবকাঠামোকে নিয়মিত চুনকাম,পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, প্রাণান্তকর দেখভাল করার কারনে শক্ত সামন্ত অবস্থায় রাখা সম্ভব হয়েছে।এখানে কোটি কোটি মুসলমানের ভালোবাসা আর আবেগ নিমজ্জিত হয়ে আছে।
আমি ভাবছিলাম দেড় হাজার বছর আগের কথা।আরবের তপ্ত লু হাওয়ায় গত কয়েকদিনের অতিবাহিত সময়ে আমার শরীরে কেতলি ভরা সিদ্ধ পানির বাষ্পের তাপের মতো যে  উত্তাপ ছড়িয়েছে,তাতেই বিশ্ময়ে অবাক মানি,এই উষ্ণ আবহাওয়া সহ্য করে প্রিয় নবির নেতৃত্বে আরবের মরুভূমিতে কী করে ইসলামের সাম্যের আলোয় নতুন এক সভ্যতা গড়ে উঠলো।
হোটেল থেকে বাস, মক্কার কাবা ঘর প্রতি দশমিনিট পরপর ছাড়ে আবার আসে।বাস ধরতে মাত্র দশ বারো গজ হাটা রাস্তা।বাসগুলো সব জার্মানির তৈরি 'মান'। ঝকঝকে নতুন,শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, অতি আরামদায়ক।  আগে আমাদের উপমহাদেশীয়, মিশর,ইয়েমেনি,আফ্রিকার গাড়ির  ড্রাইভারেরা তীর্থ যাত্রীদের নানা ভাবে হয়রানি করতো,ভাড়া নিয়ে বচসা হতো।কিংডম অব সৌদি আরব তাই এখন যে কোন যায়গা থেকে  তীর্থ যাত্রী বহন করে নিখরচায়।ড্রাইভার সাহেবদের তাই দিন খারাপ। ড্রাইভার ভাইদের দাবী আদায়ের সংগ্রাম কিংডমে বেআইনী। আমাদের দেশেতো স্বেচ্ছাচারী নিয়ম।বি আর টি সি' র বাস চালাতে দেয় না বাস মালিক সমিতি।আমরা মগের মুল্লুকে বাস করি।যার পেশিশক্তি আছে আইন তারই,এমনকি সরকারও তাদের ঘাটাঘাটি করতে চায় না।
কোন কথা বলতে চাইলাম,আর চলে গেলাম কোন দিকে।হোটেল থেকে দশ বারো গজ হাটা পথে বাস ধরতে যে উষ্ণ লু হাওয়ার ধাক্কা মুখে লাগে,তাতেই আমাদের কম্ম সাবাড়।মনে হলো  পুড়ে যাচ্ছি।তাও কিন্তু পুরো গরম হাওয়া তীর্থ যাত্রীদের গায়ে লাগতে দেয়া হয় না।হোটেলের দুপাশে তামার তৈরি পাইপের ফুটো দিয়ে ক্রমাগত শীতল বায়ু প্রবাহিত করানো হচ্ছে,হীমবাহ লু হাওয়ার সাথে মিশে ঝিরিঝিরে বাষ্প কনা হয়ে মুখে ভেজা প্রলেপ বুলায়।তবুও আমার কাছে অসহনীয় গরম লাগে,দশ গজ দূরও যেন অনেক দূর মনে হয়।
মক্কার একেবারে আঙিনর কাছে অতো বড় বাস ভিড়তে পারে না।প্রায় দুই ফার্লং পথ হাঁটতে হবে।এই হাঁটাপথ ফুরোতে দেরী হলেও ভালো লাগে।খুব ধীরে,শৃংখলার সাথে মানুষ আল্লার ঘরের পথ ধরে।ডান দিকে সেরাটন,হিলটন,সাংগ্রীলা,আরো অনেক নামি নামি হোটেল।যত কাছের হোটেল,তার ভাড়া তত বেশি। এই হোটেল গুলো থেকে পায়ে হেঁটে নামাজের জামাত ধরা যায়। যাদের অনেক টাকা,তারা অনেক বেশি আরাম কিনতে পারে।আমাদের মতো বাসে আসতে হয় না।মক্কা মদিনা আর এই হোটেল গুলো প্রায় সমার্থক ধরে নেয়া যায়।
আমি আরবের গরম আবহাওয়ার কথা ভাবি।আমাদের রাসুলের সময়ে তো বিজ্ঞানের এতো সুযোগ সুবিধা, আরাম আয়েশের উদ্ভাবন হয় নি।পঞ্চাশ বছরের আগের কাবা ঘর দেখলেই বোঝা যায়,মক্কার চারপাশ কত ক্লিষ্টতায় ভরা ছিল।  দেড় হাজার বছর আগের কথা চিন্তা করলে মনের ভেতরটা  সত্যি ভরে ওঠে,ভালোবাসায়,
সহমর্মিতায়। রাসুলের সাহাবিরা ছিলেন, একেকজন পাহাড়ের মতো স্থীর বিশ্বাসী, সত,ধার্মিক, ধনি সাহাবী কিংবা গরীব সাহাবী সবাই এক কাতারে রাসুলের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইসলামের সাম্যের বার্তা বুকে লালন করে।
মদিনায় রাসুলের রওয়াজার ওপরের স্হাপনা দেখে, তাতে হাত বুলাতে ইচ্ছে হলো। রাসুলের রাওজা আমি সরাসরি দেখতে না পারলেও জেসমিন দেখেছে,আস সালামু আলাইকা ইয়া হাবিব আল্লাহ বলেছে,কান্নাকাটি করেছে,তার মনের সব গোপন বাসনা আল্লাহর কাছে পৈাঁছে দিয়েছে। রাসুলের কবরের পাশে রিয়াজুল জান্নাত, যার সাথে সরাসরি বেহেশতের যোগ আছে,মানে আল্লাহকে সরাসরি তার আর্তি জানিয়েছে।
রাসুলের কবর জিয়ারত করে ফেরার সময় আমি লক্ষ্য করেছি জেসমিনের চোখ দুটো ফোলা।ওর অপেক্ষায় এতোক্ষণ আমি ওর হুইলচেয়ারে বসেছিলাম।কায়সার জেসমিনকে দেখতে পেয়ে বললো,
-- ভাইজান,হুইল চেয়ার ছাড়েন,ওই যে ভাবি আসছেন।
আমি মদিনার মেঝেতে বসে পড়ি।পরিষ্কার কিন্তু রাত এগারোটা বাজালেও ফ্লোর এখনো বেশ উত্তপ্ত। সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে পায়ের মাসেলে ব্যথা করছিল তাই উত্তপ্ত মেঝেতে নিজের দু'পা, হাঁটু মেলে দিলাম।গরমে পায়ে আরাম পাচ্ছিলাম।
    রাসুলের সময়ের  দেড় হাজার বছরের পুরানো স্মৃতি আলোর মতো মনকে গভীর ভাবে ভালো কিছু ভাবনায় আচ্ছন্ন করে রাখে। মদিনার সোনার মসজিদের বাইরের দিন নেই রাত নেই সেই লু হাওয়া কিন্তু ভেতরটা শীতল,মনকে অতলান্তে ডুবে থাকার যায়গা করে দেয়।হাজার যায়গা থেকে হাজার মুসলমান তীর্থ যাত্রী আসছেন,উঠে যাচ্ছেন,বাংলাদেশের সাহায্যকারীরা কোরান শরীফ,রেহাল তুলে দিচ্ছেন।পড়া শেষ হলে আবার ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন। মসজিদে নববীর ভেতরটা উজ্জ্বল সোনালি আলোয় ভরা অনেকটা তীব্র জোছনার আলোর মতো।নিমগ্নতায় ডুবে থাকার এই তো সময়।
মদিনা শরীফের বড় ইমামের ম্যানেজার আমাদের কাছের সম্পর্কীয় ভাগনা, আমাদের পারকুলের পাশের গ্রাম মঈনার আব্দুল্লাহ। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে সে মদিনার মসজিদে নববীতে  সেবা করার সুযোগ পেয়েছে। খবর পেয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে হোটেলে এলো তাঁর এই তেইশ মডেলের  নতুন  আড়াইহাজার সিসির টয়োটা লেক্সাস নিয়ে।
আব্দুল্লাহ অতিশয় ভদ্র নম্র।আমি,কায়সার,মরিয়ম আর রুমেলকে নিয়ে শহরের বিশেষ ঐতিহাসিক  যায়গা গুলো দেখাবে সে।
জেসমিন আর মরিয়মের মাকে হোটেলে রেখে আসলাম তাঁদের শারিরীক অসুবিধার জন্য।  
 গাড়িতে উঠে বসেছি।আব্দুল্লাহর ফোন এলো।এমন মোলায়েম স্বরে আরবিতে কারো সাথে কথা বলছিল,আমার মনে হলো যেন মৃদুস্বরে কোরান পড়ছে।কথা শেষ হলে আমি আব্দুল্লাহকে প্রশ্ন করি তোমার কথার ঢং তো পুরা আরবীয়। তুমিতো আর বাঙালী নও।
-- আমার জন্মইতো আরবে।
-- তুমি বিয়ে করেছো?
আব্দুল্লাহ লজ্জা পেয়ে ততধিক মাথা নিচু করে বললো,
-- জ্বি না।
-- তা হলে বলো এতো মিষ্টি আওয়াজে তুমি কার সাথে কথা বললে?
আব্দুল্লাহ হাসতে হাসতে বললো,
-- আমরা মসজিদ আল কেবলা তাইনে এসে গেছি।
কেবলা তাইন মসজিদের গুরুত্ব অতীব।আমাদের প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহিওস সালামের কাছে এই মসজিদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার সময়, ওহি আসে এখন থেকে সবাইকে জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদের পরিবর্তে কেবলা’র দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে হবে।রাসুলের সাথে যে সাহাবী গন নামাজ আদায় করেছিলেন,দেখলেন পুরো মসজিদটাই কেবলার দিকে ঘুরে গেছে।
তাই এই মসজিদের নাম হয়েছে, মসজিদে আল কেবলা তাইন।
মসজিদের বিশাল চত্বর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।চত্বর জুড়ে মাঝারি আকারের সবুজ গাছ।আব্দুল্লাহকে বললাম, 
--এই গাছের নাম কি?
আব্দুল্লাহ বললো,
 -- বাংলাদেশের নিম গাছ,প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে বাদশাহ ফয়সালকে এই গাছ উপহার দেয়া হয়েছিল। বেশিরভাগ গাছই সৌদি আরবের গরম সহ্য করতে পারেনি,তাই মারা গেছে। 
আমরা মসজিদ আল কেবলা তাইনে ঢুকে প্রথমে মসজিদে জমিয়ে রাখা বড় বড় পাত্র থেকে জমজমের পানি পান করলাম।সবাই দু'রাকাত নামাজ পড়লাম।একটু জিরোচ্ছি।খেয়াল করি তিন-চরজন তীর্থ যাত্রী আমাদের মতোই  জিরোচ্ছেন। তাঁদের একজনকে খুব চেনা লাগলো।একটু খেয়াল করতেই চিনে ফেললাম।কাছে গিয়ে বললাম,
-- আপনাকে সালাম।আমি আপনকে চিনতে পেরেছি।
-- নিশ্চয়ই আপনি  আমার দেশের, মানে বাংলাদেশের! 
আমার যতসামান্য পরিচয় দিতেই হাত বাড়িয়ে দিলেন।কোলাকোলি হলো।ছবি তুললাম।আমার দুটো হাত খুব নিবিড় করে ধরলেন,হাসতে হাসতে বললেন,দেশে তো এমন নৈকট্যের অবসর মেলেনা।
বললেন,অমুক হোটেলে আছি।
আমি বললাম,আমার পাশের হোটেলেই তো।
কত হাজার মানুষ আমরা হাজার পথে চলতে চলতে সামান্য সময়ের জন্য কাছাকাছি হই।মক্কা মদিনা সফরে কত বাঙালির সাথে দেখা হলো,কথা হলো কিন্তু চেনা মানুষের সাথে দেখা এই প্রথম।
আমাদের জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পীকার জনাব শামসুল হক টুকু মসজিদে কেবলা তাইনে বসে তসবিহ পড়ছিলেন নিমগ্নতায়,পেছন থেকে এসে তার পাশে বসে কিছুক্ষণের জন্য কাছের হয়ে গেলাম।
আব্দুল্লাহ আমাদের যতটুকু সময় বরাদ্দ দিয়েছিল,তা শেষের পথে।তাঁর বস মদিনার প্রধান ইমাম বিদেশ সফরে আছেন বলেই আমরা ওর কাছে ওতোটা সময় পেয়েছি। আব্দুল্লাহর সাথে কথা ছিল,দুপুরের খাবার এক সাথে খাবো।ওর কাছে জানতে চাইলাম,ওর কি পছন্দ। 
আব্দুল্লাহ বললো,
-- আপনারা কি খাবেন?
আমার জন্য সহজপাচ্য ফিস ফিলে।তরকারি, ডাল ভাত, এদেশের রান্না, আমরা পেট সহ্য করতে পারে নি।বললাম,
-- আমার পছন্দ আল বাইকের ফিশ ফিলে মিল।
-- আপনিও আল বাইক? আল বাইক সৌদি ফাস্ট ফুড চেইন।ম্যাকডোনাল, কেএফসি কুলিয়ে উঠতে পারছে না, আল বাইকের কাছে।একেবারে ডাউন করে দিয়েছে। 
গাড়ি থেকেই অনলাইনে অর্ডার করা হলো।ছোট ভাই কায়সার,মরিয়মের বর রুমেল আর আব্দুল্লাহ আল বাইকের আউটলেটে ঢুকলো।অনেক খাবার,গন্ধে গাড়ি মো মো করছে।বিল অলরেডি পেইড বাই আমাদের ব্রিলিয়ান্ট আব্দুল্লাহ। 
আব্দুল্লাহর পোষাক,চেহারা, হাসি এবং হাঁটার ভঙ্গি,শিক্ষা, রুচি,, নীচু স্বরে রোমান্টিক আরবীয় ভাষায় কথা বলা,সব মেলালে সে আর বাঙালি নেই,শুদ্ধ এ্যারাবিয়ান।
 

 


এ জাতীয় আরো খবর