বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬

গ্রামীণ জনপদের প্রাথমিক শিক্ষা

  • রীতা রায়
  • ২০২৩-০৯-২৩ ২৩:৫১:৫৮

"গ্রামই হবে আমাদের রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দু,এজন্য গ্রামের উন্নয়ন দরকার "- এই গুরুত্বপূর্ণ উক্তিটি করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন হওয়া তাঁর  স্বপ্নের বাংলাদেশে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ এ প্রত্যাবর্তন করে তিনি প্রথমে  যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনযোগ দেন। দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সোনালী ফসলে ভরা, কৃষকের মুখে হাসি ফোটা বাংলাদেশ চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে গ্রামের উন্নয়নের কথা প্রথমেই চিন্তা করলেন তিনি। কারণ বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ।কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের দেশও উন্নত হবে, হবে স্বনির্ভর। বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন কতটুকু পুরণ হয়েছে তা চলুন সবাই নিজের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করি।চলুনে ঘুরে আসি গ্রামীণ জনপদের প্রাথমিক বিদ্যালয়েঃ
একদম চুড়ান্ত সত্যকথা দিয়ে শুরু করি। 
গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মান,শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে কথা উঠলে আমাদের বিজ্ঞজনেরা,বিদ্যার মহারথীগণ নাক সিটকান,কান সিটকান।মুখের লাগাম ছাড়াই ধুয়ে দেন প্রাথমিক শিক্ষকদের। এ যেন খাস জমির মতোই, যার যা খুশি করতে পারেন।প্রাথমিক শিক্ষক যেন ভিন গ্রহের কোন অবাঞ্ছিত প্রাণী।তারা যেন পূর্বজন্মের পাপের ফল ভোগ করছে।।  

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক  মানেই সাদা-কালো  চুলের মাঝবয়েসী বা বৃদ্ধ, অশক্ত  রোগা-সোগা মানুষ। এই চিত্রটিই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে।যার কপালে অনেক গুলো দারিদ্র্যের ভাজ।তার পোশাকে, চলনে,বলনে শুধুই দারিদ্রতা।। 
স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও এর কতটুকুই বা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেটা সবারই জানা।পুরুষ অবিবাহিত শিক্ষকদের কোন মেয়ের বাবা তাকে কন্যাদান করতেই চান না। আর জেনে শুনে কোন মেয়েও প্রাথমিক শিক্ষক কে বিয়ে করতে চান না। এ লজ্জা কার? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই নিরীহ শিক্ষকের?  না যারা রাষ্ট্রের উচ্চ আসনে বসে বিদেশে টাকা পাচার করে একশো টা বাড়ি বানাচ্ছেন তাদের?  বিবেকবান মানুষেরা তা সবাই জানি।

এত অভাব সত্ত্বেও কোন প্রাথমিক শিক্ষককে কেউ কি অসৎ পথে উপার্জন করতে দেখেছেন?  না দেখেননি, তারা যেমন অসৎভাবে অর্থ উপার্জন করেনা,তারা কোন ব্যাবসা- বাণিজ্যেও নেই।না তারা কোন রাজনৈতিক  দলের সাথে যুক্ত আছেন।দোষ তাদের এটাই। তারা অতি সাধারণ মানুষ, সাধারণ জীবন - যাপন করে  সেজন্য ইচ্ছে করলেই তাদের অপমান, অসম্মান করা যায়।কারণ তার রক্ষার জন্য কোন রাজনৈতিক ছত্রছায়া নেই। যখন যেই সরকার আসেন তিনিই তার আারাধ্য,আর আরাধ্যের যত নিয়ম - কানুন।কাজের বোঝা নিরবে, নির্দিধায়,বিনাবাক্যে কাধে তুলে নেন সেই তথাকথিত পন্ডিত মশাই। 
কথায় আছে, " যার নাই কোন গতি,সেই করে পন্ডিতি।"  হা হা হা! কি মজা বলুন তো? 
২০০ টাকা মাসের টিফিন ভাতা,যাতে দিনে এক কাপ চাও পাওয়া যায় না। আরে সেতো  ছোট চাকরি করে, তার আবার চা খাওয়ার অভ্যাস? যার নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার আবার বনেদিপনা কিসের?  
সবার মুখে একই কথা,সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কিন্ডারগার্টেনে এ চলে যাচ্ছে। ঠিক আছে যাচ্ছে। তারা সংখ্যায় কতজন? 
শতভাগ না অর্ধেক না ২৫ %। এটা আগে নির্ণয় করা উচিত। কান নিয়েছে চিলে এর মতো করলে তো আর হয় না।

আচ্ছা বলুন তো বাংলাদেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিদেশে বাড়ি করেন কেন? বাংলাদেশে কি তাদের থাকা- খাওয়ার মতো জায়গা বা সম্পদ নেই? নিশ্চয়ই বলবেন সেই দেশগুলোতে নিরাপত্তা বেশি। কারণ তাদের আইনের শাসন ব্যবস্থা ও আইনের প্রয়োগ সঠিক ভাবে হয়।যেটা এদেশে হয় না। কেন হয় না? এদেশের নীতিনির্ধারক কারা? তারাই তো। যারা দেশের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়ে, সব রকম আরাম - আয়েশ, সুযোগ - সুবিধা ভোগ করে।জনগণের কথা ভাববার সময় পান না।নিজেরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরেননা তাদের কি কোন দায় নেই? তারা কি সত্যি দেশপ্রেমিক না দেশদ্রোহী এটাও ভাবার বিষয়। তারা নিজের দেশ গঠনের জন্য সঠিক কাজ করবেন না,অথচ দেশের টাকায়  শুধু ফুটানি করবেন। হযবরল হিসেবের খাতা তাদের। তো তারা যদি এটা করতে পারে, তাহলে গ্রাম থেকে দু- একটা শিক্ষার্থী শহরের চাকচিক্যের স্কুলে যেতে পারে। এতে হা হা রে রে করার কি আছে আমি বুঝালাম  না। হুজুগে বাঙালি,এক শেয়ালের রা এর সাথে অন্য শেয়াল সুর মেলাতে দেরি করেন না।

আবার কোন কোন সাংবাদিক মুখরোচ সাংবাদ তৈরি করতে ও ছাড়েননা।করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সেই সাংবাদিক বা সেই উপজেলা চেয়ারম্যান কতটুকু সৎ, সেটা নিশ্চয়ই কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।তাহলে তাদের সৎ বিচার বুদ্ধি কতটুকু সেটা নিয়ে ভাববার বিষয় আছে কিনা বলুন? আচ্ছা আমিই বলি,গ্রামীণ জনজীবন কৃষিনির্ভর, এটাতো সবারই জানা।এই গ্রামীণ জনপদের কত শতাংশ মানুষের নিজস্ব চাষ জমি আছে এটা একটু বিবেকবান মানুষেরা ভাববেন। এখানে একটা কথা এসেই যায় যে,যারা ভুমির মালিক তাদের সন্তানেরাই বেশিরভাগ শহুরে স্কুল এ লেখাপড়া করে থাকে। আর দু" একজন অটোরিকশা চালক,আর দু' একজন গ্রামের ব্যবসায়ি, যারা নিজেদের আয়ের চেয়ে ব্যয় করতে বেশি পছন্দ করে আর অন্ধভাবে অন্য জনকে অনুকরণ করে। এবং তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে নাক সিটকান। তারা কিন্ডারগার্টেনে লেখাপড়াটাকে বিলাসিতা মনে করেন। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য পরে থাকে তথাকথিত অবহেলিত শ্রমজীবী মানুষের সন্তানেরা।
এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে প্রাথমিক শিক্ষক যেহেতু তৃতীয় শ্রেশীর পেশাজীবি, তারা অবহেলার মর্ম জানে।তাই তারা পরম মমতায় সেই শিশুদের শিক্ষা দান করে থাকেন। বাইরে থেকে আপনারা অনেক কথাই বলেন। বাইরের দেখাতে কি সব? এটা আপনাদের বোঝার ভুল।
একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ টি ক্লাস নিতে হয়। শুধু ক্লাস নেওয়ায় নয়, পাঠটীকা,উপকরণ, হাজিরা খাতা মেইনটেইন, ওয়ানডে ওয়ান ওয়ার্ড লেখা,রিটার্ন মেইনটেইন করতে হয়।এছাড়াও যাবতীয় অফিসের কাজ করতে হয়।

শিক্ষক, কবি লেখক

এ জাতীয় আরো খবর