শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬

কুতুবজোমে কলেজছাত্রীকে তুলে নেওয়া: অপহরণ নাকি প্রেমের জট?

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-০২ ২৩:২০:০১

মহেশখালী কক্সবাজার 
মহেশখালী  উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা এলাকায় এক কলেজছাত্রীকে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, সশস্ত্র একটি দল ঘরে ঢুকে জোরপূর্বক মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, এটি দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের জেরে স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা হতে পারে।
ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় এখন উত্তেজনা, আতঙ্ক ও নানা গুঞ্জন বিরাজ করছে। ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তবে প্রশাসন বলছে, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
সরেজমিনে ঘটিভাঙ্গা: আতঙ্ক, উত্তেজনা আর নানা প্রশ্ন ঘটনার পরদিন সরেজমিনে ঘটিভাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় চায়ের দোকান, বাজার ও বিভিন্ন আড্ডাস্থলে ঘটনাটি নিয়েই আলোচনা চলছে। কেউ পরিবারের বক্তব্যকে সমর্থন করে অপহরণের অভিযোগ তুলছেন, আবার কেউ বলছেন এটি প্রেমঘটিত পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার (১ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ এলাকায় চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়। কিছু যুবক দ্রুত একটি বাড়িতে প্রবেশ করে এবং পরে এক তরুণীকে নিয়ে বের হয়ে যেতে দেখা যায় বলে দাবি করেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী।
ঘটনার আকস্মিকতায় আশপাশের মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়েন। অনেকেই ভয়ে সরাসরি বাধা দিতে সাহস পাননি বলেও জানান।
পরিবারের দাবি: ‘মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নেওয়া হয়েছে’ ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, সুমাইয়া সুলতানা (১৭) ঘটনার সময় নিজ বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে ছিলেন। এ সময় স্থানীয় যুবক জাহেদ, জিদান, বারেক, ফারুকসহ ২০-২৫ জনের একটি দল বাড়িতে ঢুকে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
সুমাইয়ার মা কুলসুমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“আমার মেয়েকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে। আমরা বাধা দিলে আমার স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মারধর করা হয়। এখনো মেয়ের কোনো খোঁজ পাইনি।”
পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, স্থানীয় বিএনপি নেতা আকবরের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও মেয়েকে উদ্ধারের দাবি জানান।
সুমাইয়ার বাবা সোনামিয়া বলেন,“আমি মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা আমাকে মারধর করে সরিয়ে দেয়। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য,ঘটনার সময় আশপাশে অবস্থান করছিলেন এমন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জানান, বাড়ির সামনে হঠাৎ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও লোকজনের জটলা দেখতে পান তারা।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,“সবকিছু খুব দ্রুত হয়েছে। মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।”
আরেকজন বলেন,“লোকজন এগিয়ে গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলে শুনেছি। পরে সবাই আতঙ্কে দূরে সরে যায়।”
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ প্রকাশ্যে নাম বলতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের ভিন্ন দাবি: ‘তাদের প্রেমের সম্পর্ক ছিল’অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ বলছেন, ঘটনাটির পেছনে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুমাইয়া ও একই এলাকার জাহেদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ছিল। পরিবার বিষয়টি মেনে না নেওয়ায় তারা হয়তো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একজন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,“তাদের সম্পর্কের কথা এলাকায় অনেকেই জানত। এখন এটি অপহরণ নাকি স্বেচ্ছায় চলে যাওয়া—তা তদন্ত ছাড়া বলা কঠিন।”
আরেকজন বলেন,“এখন দুই পক্ষ দুই ধরনের কথা বলছে। প্রকৃত সত্য বের করা পুলিশের দায়িত্ব।”
এলাকায় থমথমে পরিস্থিতিঃঘটনার পর থেকেই ঘটিভাঙ্গা এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি-মহেশখালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মেয়েটির অবস্থান শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালানো হচ্ছে।
থানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন,“ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আমরা কাজ করছি। এটি অপহরণ নাকি প্রেমঘটিত পালিয়ে যাওয়া সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।”
তিনি আরও বলেন,“মেয়েটিকে উদ্ধারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই অনেকেই মন্তব্য করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া গুজব ছড়ানো পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তাই প্রশাসনের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ না বলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব এবং সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।


এ জাতীয় আরো খবর