সোমবার, জুন ২৯, ২০২৬

অবৈধ ডাম্পার-পিকআপে মাটি,বালু ও গাছ পরিবহন;উজাড় হচ্ছে পাহাড়-বনাঞ্চল,বাড়ছে প্রাণহানি

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৬-২৮ ১৭:০৫:৫৩

মহেশখালী (কক্সবাজার)
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে ডাম্পার মালিক সমিতির আড়ালে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার মাটি, নদী-খাল ও ঝিরি থেকে উত্তোলিত বালু এবং  সংরক্ষিত  বনাঞ্চলের  গাছ পরিবহনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। 
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের  কিছু  অসাধু  কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ ও নিয়মিত মাসোয়ারার মাধ্যমে  উপজেলার  বিভিন্ন সড়কে ৪০টিরও অধিক অবৈধ  ডাম্পার  (ছোট ট্রাক)  ও  পিকআপ  অবাধে চলাচল করছে।
অভিযোগ  রয়েছে, এসব  ডাম্পার  ও  পিকআপের মাধ্যমে  দিনে-রাতে   মহেশখালীর   বিভিন্ন  পাহাড়ি এলাকা থেকে অবৈধভাবে  মাটি  কেটে ও  সরকারি খাল  থেকে  সেলুমেশিন  বসিয়ে অবৈধ ভালো বালু উত্তোলন করে পরিবহন করা হচ্ছে। 
একইসঙ্গে ঝিরি,খাল ও নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। 
এছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কেটে আনা গাছও প্রকাশ্যে পরিবহন করা হলেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। 
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ,ডাম্পার মালিক সমিতির সঙ্গে পাহাড়খেকো,বালুখেকো ও বনখেকোদের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। 
তারা প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে কিংবা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। 
এই সিন্ডিকেটের কারণে মহেশখালীর নদী-খাল, প্রাকৃতিক  ঝিরি,  সংরক্ষিত  পাহাড় ও বনাঞ্চল 
ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা বলছেন,যেভাবে নির্বিচারে পাহাড়  কাটা  ও  বালু  উত্তোলন চলছে, তাতে দ্বীপ উপজেলা   মহেশখালীর    পরিবেশগত    ভারসাম্য
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 
বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা,খাল ভরাট এবং জীববৈচিত্র্যের  ওপর  নেতিবাচক   প্রভাব  ইতোমধ্যে দৃশ্যমান  হয়ে   উঠেছে।  অনেক  এলাকায়  প্রাকৃতিক ঝিরির  স্বাভাবিক  প্রবাহ  বন্ধ হয়ে  যাওয়ায়  কৃষি ও জনজীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়,প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে-মধ্যে অবৈধ ডাম্পার ও পিকআপের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। 
অভিযানে মাটি,বালু ও চোরাই কাঠবোঝাই একাধিক যানবাহন  আটকও  করা   হয়েছে।  তবে  অধিকাংশ ক্ষেত্রে নামমাত্র জরিমানা আদায় করে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযানের কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে না; বরং সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
মহেশখালীর   বিভিন্ন   গুরুত্বপূর্ণ  সড়কে  অবৈধ ডাম্পারের বেপরোয়া চলাচলে জনদুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে। ভারী যানবাহনের কারণে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,সৃষ্টি হচ্ছে ধুলাবালি 
ও শব্দদূষণ। 
স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী,নারী ও সাধারণ পথচারীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ডাম্পারের চাপায় ও দুর্ঘটনায় শিশুসহ  অন্তত  ১২  জনের  বেশি  মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। 
তবে  দুর্ঘটনার  পর একটি প্রভাবশালী মহল সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ  বিষয়ে  স্থানীয়  সচেতন  নাগরিক, পরিবেশকর্মী ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা অবিলম্বে অবৈধ ডাম্পার চলাচল বন্ধ,  পাহাড়  কাটা  ও  বালু  উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের  বিরুদ্ধে  কঠোর  আইনগত   ব্যবস্থা  গ্রহণ এবং   সংরক্ষিত  বনাঞ্চল   রক্ষায়  কার্যকর  অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। 
একইসঙ্গে  তারা  মহেশখালীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থায়ী ও কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা বলেন, “মহেশখালী  একটি   পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপাঞ্চল। এখানে পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস করা হলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়  দেখা  দিতে   পারে।   তাই  এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”


এ জাতীয় আরো খবর