পাইকগাছার কপিলমুনিতে মা’কে হত্যা মামলার প্রধান আসামী আপন চাচা জামিনে বেরিয়ে মামলার বাদী নিহতের দু’শিশু সন্তানকে জীবননাশের হুমকিসহ মিথ্যা লুটের মামলার ঘটনায় সোমবার (১৫ জুন) সকালে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কপিলমুনির কাশিমনগর বাজারে অয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছোট বোন তাসমিরা খাতুন (১৪) কে সাথে নিয়ে লিখিত বক্তব্যে নিহত রাশিদা বেগমের ছেলে মো: রিফাত গাজী (২০) বলে, সে একজন ভাটা শ্রমিক। ২০২১ সালে পিতার আকষ্মিক মৃত্যুর পর মা,ছোট বোন ও দাদীর ভরনপোষণে সে ভাটায় শ্রম বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে।
একপর্যায়ে সে বরিশালে ইটভাটায় অবস্থাকালীন গত ১৩ ডিসেম্বর ২৫’ সকালে তাকে মোবাইলে ফোনে জানানো হয় তার মাকে হত্যার পর তার লাশ বাড়ির লিচু গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর বাড়িতে পৌছে জানতে পারে, তাকে তার আপন কাকা মহিদুল হত্যা করেছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর সহযোগীতায় কপিলমুনি ফাঁড়ির পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়েছে। এরপর স্বজনসহ থানায় গিয়ে সে বাদী হয়ে মহিদুল গাজীকে প্রধান করে অজ্ঞাত পরিচয় আরোও ১/২ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। যার নং-৭।
এরপর গত ২১ এপ্রিল ২৬’ চাচা মহিদুল গাজী মামলায় জামিনে বেরিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাকে ও আমার বোন তাসমিরা খাতুন (১৪) সহ মামলার অন্যান্য স্বাক্ষীদের বিভিন্ন প্রকারের ভয়ভীতি ও হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে। এমনকি মামলা তুলে না নিলে আমার বোনেরও মায়ের পরিণতিসহ জীবননাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। এ ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তায় আমি গত ১১ জুন পাইকগাছা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছি। যার নং-৫৪০।
এছাড়া মহিদুল গাজী তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে হুমকি-ধামকির পাশাপাশি আমাকে প্রধান করে মামলার স্বাক্ষীসহ স্বজনদের বিরুদ্ধে ৭ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাত আরোও ১৫/১৬ জনকে আসামী করে পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি,আর-৪০৪/২৬ নং মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে।
মামলায় উল্লেখ করা হয় যে, ঘটনার দিন আমার মা’ গলায় রশি দিয়ে আত্নহত্যা করলে আমরা পরষ্পর যোগসাজশে তাকে মারপিট করে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে বেধে রেখে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়।
তাকে জেলে আটক রেখে পরিকল্পিতভাবে তারা তার বসতঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মালামালা নিয়ে ১০ লক্ষ টাকার ক্ষতিসাধন করে। এছাড়া আলমারীতে থাকা নগত টাকা, স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য জিনিষপত্র যার মূল্য ৭ লক্ষ টাকা, দুধ বিক্রির ২০ হাজার টাকা আমি চুরি করি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মাছের খাদ্য, পুকর থেকে ১৫ লক্ষ টাকার মাছ, ৫০ হাজার টাকার কলা চুরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
সংবাদ সম্মেলনে রিফাত আরোও জানায়, সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই ছোট বোন ও বৃদ্ধা দাদীকে নিয়ে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় নিজ ঘরে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে তারা। সে জানায়, ইতোমধ্যে মামলায় ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রদান সাপেক্ষে মামলার আইও কপিলমুনি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো: মনিরুল ইসলাম গত ৩১ জানুয়ারী ২৬’ আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। যেখানে তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিভ মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ড. রনি কুমার ব্রহ্ম’র প্রস্তুতকৃত ময়না তদন্ত রিপোর্টের উদ্বৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, তার মা রাশিদা বেগম আত্নহত্যা করেছে। ফলে পেনাল কোডের ৩০২/৩৪ ধারা থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে তার বিরুদ্ধে ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রমানের কথা সংযুক্ত করা হয়েছে।
রিফাত জানায়, তার পিতার মৃত্যুর পর চাচা মহিদুল মা রাশিদাকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে উত্যক্ত করত। অস্ত্রের মুখে তাকে যৌণ হয়রাণি ও কু-প্রস্তাবসহ অনৈতিক কর্মকান্ডের ঘটনায় এলাকায় একাধিকবার শালিসী বৈঠকও বসে। মায়ের সাথে জোরপূর্বক অনৈতিক সম্পর্কের জেরে আমার চাচির সাথে চাচার সম্পর্কও ঘটনার সময় ভাল ছিলনা। অধিকাংশ রাতে চাচা বাইরে থাকতো। এমনকি বাড়িতেও তার খাওযা-দাওয়া বন্ধ ছিল। ঘটনার রাতে আমার মাকে চাচা বাইরে থেকে ডেকে বের করে নেওয়ার পর আমার মা আর ঘরে ফেরেনি। এমনকি বাইরে থেকে ঘরের শিকলবন্দি করা ছিল। এরপর সকালে লিচু গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তকালে শরীরের নানা অসংগতি, তাৎক্ষণিক পুলিশের বক্তব্য ও বিভিন্ন মিডিয়ায় এর প্রেক্ষিতে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। অথচ তার মায়ের ময়না তদন্ত রিপোর্টে আত্নহত্যা করেছে বলে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি তার মায়ের পূণ:ময়নাতদন্ত সহ মহিদুলের বিচার দাবি করে।
সংবাদ সম্মেলনে আরোও উল্লেখ করা হয় যে, তার চাচী মহিদুলর স্ত্রী জাকিয়া বেগম, তার পিতার প্রথম স্ত্রী ছিল। পিতার সাথে দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যা সন্তানের জন্মের পর পরকীয়ায় আবদ্ধ করে তাকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে মহিদুল। এরপর তার পিতা এনামুল গাজী তার মা’ নিহত রাশিদা খাতুনকে বিয়ে করেন। এহেন নানা কারণে পিতা এনামুলের সাথে চাচা মহিদুলের দু:স্পর্ক দীর্ঘ দিনের। এরপর পিতার আকষ্মিক রহস্যজনক মৃত্যুর পর তার মাকে উত্যক্ত, জোরপূর্বক যৌণ সম্পর্ক ও সর্বশেষ হত্যার বিষয়টি তার দীর্ঘ দিনের পূর্ব শত্রুতারই বহি:প্রকাশ। যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকার দলীয় লোকজনের সাথে সখ্যতা থাকায় তাদের ছদ্মাবরণে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়ি ছিল। এমনকি ৫ আগস্ট জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের দিনও সে কপিলমুনি জামে মসজিদ সংলগ্ন আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সশস্ত্র মহড়ায় উপস্থিত ছিল।
সর্বশেষ তার এতিম দু’ ভাই-বোন ও তাদের বৃদ্ধ দাদী তার অব্যাহত হুমকির মুখে জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে। এমনকি সন্ধ্যা নামার আগেই তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্যত্র রাত্রিযাপন করছে। রিফাত জানায়, তারা জীবনে বেঁচে থাকতে চায়। এজন্য তারা স্থানীয় প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।