শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

কোরবানির তাৎপর্য: কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৫-২২ ১৭:০১:৫৮
ফাইল ছবি

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মত্যাগ, তাকওয়া, আনুগত্য ও মানবিকতার এক অনন্য শিক্ষা। কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার প্রতীক। কোরআন ও সহিহ হাদিসে কোরবানির গভীর তাৎপর্য, উদ্দেশ্য ও শিক্ষা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কোরবানির সূচনা ও ইতিহাসঃ
কোরবানির ইতিহাস মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই শুরু। পবিত্র কোরআনে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বলেন-
-'আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন। যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করল,তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না।'
(সূরা আল-মায়িদা: ২৭)।
তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য কোরবানির সবচেয়ে বড় আদর্শ হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ।
আল্লাহ তাআলা স্বপ্নে ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি বিনা দ্বিধায় আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত হন। পুত্র ইসমাইল (আ.)-ও ধৈর্য ও আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন-'অতঃপর যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাঁর পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল,তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম-হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ।'(সূরা আস-সাফফাত: ১০৩-১০৫)।
এরপর আল্লাহ ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠান এবং সেই থেকে কোরবানির বিধান চালু হয়।

কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্যঃ
১. আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য

কোরবানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। ইবরাহিম (আ.) নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানকেও আল্লাহর আদেশের সামনে তুচ্ছ মনে করেছিলেন।
আজকের মুসলমানের জন্যও কোরবানির শিক্ষা হলো-নিজের প্রবৃত্তি, লোভ, অহংকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ করা।
২. তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমঃ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন- 'আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।' (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)।
অর্থাৎ কোরবানির মূল উদ্দেশ্য পশুর রক্ত ঝরানো নয়; বরং মানুষের অন্তরের খাঁটি ঈমান,আল্লাহভীতি ও আন্তরিকতা অর্জন করা।
৩. আত্মত্যাগের মহান শিক্ষাঃ
কোরবানি মানুষকে শেখায়-জীবনে বড় কিছু অর্জন করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সম্পদ,সময়,স্বার্থ এমনকি প্রয়োজন হলে জীবনও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে।
৪. সামাজিক সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠাঃ
কোরবানির মাংস গরিব,অসহায় ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ বলেন- 'তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাওয়াও।' (সূরা আল-হাজ্জ: ২৮)
এ শিক্ষা সমাজে বৈষম্য কমিয়ে মানবিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করে।

কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস-
রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,রাসূল (সা.) বলেছেন- 'কোরবানির দিনের আমলের মধ্যে আল্লাহর নিকট পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।' (সুনানে তিরমিজি)।
অন্য হাদিসে এসেছে-'যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করে না,সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
এ হাদিসগুলো কোরবানির গুরুত্ব ও মর্যাদা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

কোরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষাঃ
কোরবানি মানুষকে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। শুধু পশু জবাই করলেই কোরবানি পূর্ণ হয় না; বরং মানুষের অন্তরের পশুত্ব-হিংসা,অহংকার,লোভ,অন্যায় ও স্বার্থপরতাকেও জবাই করতে হয়।
আজ সমাজে দুর্নীতি,অবিচার,প্রতারণা ও হিংসা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া।

বর্তমান সমাজে কোরবানির বাস্তব তাৎপর্যঃ
বর্তমানে অনেক সময় কোরবানি প্রতিযোগিতা,প্রদর্শন বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়। অথচ ইসলামে কোরবানির মূল শিক্ষা হলো বিনয়,আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি।
কোরবানির মাধ্যমে আমাদের শেখা উচিত-অপচয় পরিহার করা,গরিবদের পাশে দাঁড়ানো,হালাল উপার্জন করা,অহংকার ত্যাগ করা,সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা।

কোরবানির বিধান ও করণীয়ঃ
যে মুসলমান প্রাপ্তবয়স্ক,সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক,তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
কোরবানির পশু হতে হবে সুস্থ,নির্দিষ্ট বয়সের এবং ত্রুটিমুক্ত।

কোরবানির সময়:১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
কোরবানি শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি,আত্মত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের এক মহান শিক্ষা। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাস মুসলিম জাতিকে আজও আল্লাহর পথে অবিচল থাকার প্রেরণা দেয়।
যদি কোরবানির মাধ্যমে মানুষের অন্তরে তাকওয়া,মানবিকতা ও ন্যায়বোধ জাগ্রত হয়,তবেই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করে জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।


এ জাতীয় আরো খবর