ওরা বলে-
এটা নাকি কেবল কৌশল,
কেবল মানচিত্রে টানা কিছু রেখা,
কেবল শক্তির হিসাব।
আমি দেখি-
টেলিভিশনের নীল পর্দা ভেদ করে
আগুনের রঙ এসে লাগে শিশুর খাতায়,
স্কুলের অঙ্কের খাতা হয়ে যায় শরণার্থীর তালিকা।
যুদ্ধ,
একটা শব্দ মাত্র-
কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে
ভাঙা হাসপাতালের জানালা,
রক্তমাখা সাদা ব্যান্ডেজ,
আর মায়ের কাঁধে নিথর শিশুর ওজন।
ওরা টেবিলে বসে বোতাম টিপে বলে
নির্ভুল আঘাত।
আকাশে ড্রোন ওঠে,
নিচে নামে ভাঙা ছাদের শব্দ।
একেকটা ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যায়
যেন দাবার ঘোড়া,
আর শহরগুলো হয়ে যায়
বোর্ডের কালো-সাদা ঘর।
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা-
খেলছে কারা?
যাদের ঘর কংক্রিটের নিরাপদ দেয়ালে ঘেরা,
যাদের সন্তানদের জন্য
বাঙ্কার নয়, আছে বাগান।
আর যারা মরে-
তারা খবরের নিচের স্ক্রলে ভেসে ওঠা সংখ্যা,
একটু পরেই বদলে যায়।
একটা বাজারে আগুন লাগলে
শুধু দোকান পুড়ে না,
পুড়ে যায় এক বৃদ্ধের সারাজীবনের সঞ্চয়,
এক কিশোরীর বিয়ের স্বপ্ন,
এক মায়ের রান্নাঘরের হাঁড়ি।
সমুদ্রের ধারে জাহাজ ডোবে,
আকাশে সাইরেন বাজে,
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে মানুষ-
কেউ প্রার্থনা করে,
কেউ মোবাইলের আলোয় শেষ বার্তা লেখে,
আমি ভালো আছি লিখতে লিখতেই
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যুদ্ধ নাকি অনিবার্য-
এ কথা যারা বলে
তারা কি কখনও শুনেছে
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা কণ্ঠের শব্দ?
তারা কি জানে
একটি শিশুর প্রশ্ন-
আমার স্কুলটা কোথায় গেল?
মানচিত্রে লাল দাগ বাড়ে,
শেয়ারবাজারে ওঠানামা করে দাম,
তেলের গ্রাফ চড়ে বসে শিখরে,
আর নেমে যায় মানুষের মর্যাদা।
যুদ্ধের বোর্ডে
সবচেয়ে দুর্বল ঘুঁটিগুলোই আগে পড়ে যায়।
পিয়াদারা কখনও জেনারেল হয় না,
তাদের কবরের ওপর
লেখা থাকে না ইতিহাসের গৌরবগাথা।
তবু পৃথিবী থামে না-
একটি নার্স ধ্বংসস্তূপের পাশে
একটি নবজাতককে জড়িয়ে ধরে,
একজন স্বেচ্ছাসেবক
ধোঁয়ার ভেতর থেকেও
খুঁজে ফেরে জীবনের চিহ্ন।
এই পৃথিবী এখনো টিকে আছে
কারণ সব মানুষ যুদ্ধ চায় না।
কেউ কেউ এখনো গাছ লাগায়,
কেউ বই ছাপায়,
কেউ কবিতা লেখে-
যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
শিখে নেয়,
খেলা আর হত্যার মধ্যে
আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
যুদ্ধ যদি খেলা হয়,
তবে মানবতা হোক তার শেষ বাঁশি-
যেখানে ঘোষণা হবে
এই খেলা বন্ধ।
কারণ প্রতিটি শিশুর হাসি
যে কোনো বিজয় মিছিলের চেয়ে বড়,
প্রতিটি জীবিত মানুষের শ্বাস
যে কোনো পতাকার চেয়ে মূল্যবান।
আর একদিন-
মানচিত্রে নতুন রেখা টানার বদলে
মানুষ হাত ধরবে মানুষের,
আর ইতিহাস লিখবে-
পৃথিবী একসময় যুদ্ধ খেলত,
এখন সে শিখেছে বাঁচতে।