রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

অ রু ণি মা চ্যা টা র্জী

  • আত্মজিজ্ঞাসা
  • ২০২৬-০১-০৬ ০৯:০০:৩৮

শেখার কোনো বয়স নেই। লজ্জা নেই।
নমনীয়তা থাকলে, যা শেখা হয়নি, তা যে কোনো বয়সেই শেখা যায়, বা শেখা উচিত। এই কথাটা আজ আর কোনো নীতিবাক্য নয়, আমার জীবনের চূড়ান্ত উপলব্ধি। আর এই উপলব্ধির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন আমার বাবা ! ভোলা বাবা।
তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত রকমের মানুষ। বহুমুখী প্রতিভা ! ভার্সিটাইল জিনিয়াস। ছবি আঁকতেন এমন গভীর মনোযোগে, যেন রঙের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা। গান করতেন প্রাণ খুলে, আর কবিতা লিখতেন এমন স্বাভাবিকতায়, যেন শব্দ তাঁর কাছে আশ্রয় পেত। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় পরিচয় ছিল ! তিনি মানুষ গড়ার কারিগর।
একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে আশ্চর্য গুণ ছিল, প্রত্যেক ছাত্র মনে করত, সেই-ই বাবার সবচেয়ে প্রিয়। এই অনুভব করানোর ক্ষমতা কেবল বিদ্যার নয়, মানুষের প্রতি নিখাদ বিশ্বাসের ফল। গৃহী হয়েও আমি তাঁকে সন্ন্যাসী ভাবতাম। আদর্শের সঙ্গে আপস না করার জন্য তিনি বহুবার ছাঁটাই হয়েছেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জেলেও গেছেন। তবু তাঁর চোখে কোনো ক্লান্তি দেখিনি । দেখেছি শুধু একরাশ বিশ্বাস।
তবু, বাবা নিখুঁত ছিলেন না। একটি দুর্বলতা ছিল তাঁর। আর সেই দুর্বলতাটুকু না থাকলে হয়তো তাঁকে ঈশ্বর বলা যেত। ঈশ্বর ইচ্ছে করেই মানুষের মধ্যে অসম্পূর্ণতা রেখে দেন !  যেন আমরা তাঁদের স্মরণ করি, প্রশ্ন করি, বিচার করি।
বাবার সেই দুর্বলতা ছিলাম আমি !  তাঁর একমাত্র কন্যা।
তিনি আমাকে বাস্তববাদী করে তোলেননি। তিনি আমাকে আলো দেখিয়েছেন। অঢেল আলো। দক্ষিণের জানলা খুলে হৃদয়ে মুক্ত বাতাস ঢুকিয়ে দিয়েছেন। পূর্বের জানলা সারাক্ষণ খোলা ছিল !  সূর্যের আলোর মতো উজ্জ্বল ছিল বাবা-মেয়ের মন। কিন্তু আলোর বিপরীতে যে অন্ধকার থাকে, এই সত্যটা তিনি শেখাননি। আজ বুঝি, এই না-শেখানোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভাব।
আজ তাঁর স্মৃতি তর্পণ করতে গিয়ে বারবার চোখ ভিজে উঠছে। বাবার প্রথম শিক্ষক জীবনের কথা মনে পড়ছে। তখন তাঁর অধিকাংশ ছাত্রই ছিল ফার্স্ট জেনারেশন এডুকেশন ! যাদের পরিবারে শিক্ষার কোনো পূর্বসূরি নেই। তিনি ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ক্লাসে ঢুকেই বুঝেছিলেন !  এদের আগে ইংরেজি শেখানো নয়, শেখাতে হবে ভাবতে।
সে সময় রচনা মানেই ছিল নিরাপদ বিষয় !  শৃঙ্খলার গুরুত্ব, ছাত্রদের কর্তব্য, দুর্গাপুজো। একদিন বাবা সেই গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন,
“কলকাতা এক ক্লান্ত ঘোড়া।”
বললেন, কাল এই বিষয়ে কিছু লিখে আনবে।
ছাত্ররা হতবাক। তারা তখন ক্লাস টেনে পড়ে, চিন্তার স্বাধীনতা তাদের কাছে অপরিচিত। তবু পরদিন অনেকেই লিখে এনেছিল। বাবার জহুরি চোখ ঠিকই চিনে নিয়েছিল কয়েকটি উজ্জ্বল মেধাকে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর আজীবনের লড়াই !  গরিব, মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে।
আজ সেই ছাত্রদের অনেকেই কলেজের অধ্যাপক, কেউ খবরের কাগজের সাংবাদিক। যারা টাকা দিতে পারত না, বাবা তাদের কাছে ফি চাননি। বরং কোনো ছাত্রকে দেখে বলতেন !  “তোকে খুব রোগা দেখাচ্ছে,” তারপর নিজের সামান্য মাইনের মধ্যেই কিছু টাকা দিয়ে বলতেন ,“এক মাস ভালো করে দুধ খাস।” ছেঁড়া জামা পরা ছাত্রকে জামা কিনে নিতে বলতেন। আমার বাবার স্কুল প্রেমিসেসের মধ্যে এক প্রান্তে একটি চৌবাচ্চা ছিল। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্ররা নির্দ্বিধায় ওই চৌবাচ্চার জল পান করতো। বাবা একদিন চক দিয়ে সেই চৌবাচ্চার গায়ে লিখে দিলেন, "জলের আরেক নাম জীবাণু !"ছাত্রদের বোঝালেন সবজল খেতে নেই। টিফিনের সময় উদ্বেগ নিয়ে খাড়াই সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে বাচ্চা-বাচ্চা ছাত্ররা অতি উৎসাহে নামার সময় পা জড়িয়ে পড়ে না যায়। ! বেশিরভাগ ছাত্র টিফিন আনতো না ! বাবা অবশ্যই নিজে বেশি এবং অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকেও সামান্য কিছু কিছু অর্থ নিয়ে সেই সব ছাত্রদের টিফিনে ছোলা মুড়ি বাদামের ব্যবস্থা করেছিলেন। 
প্রায় দিন বাড়িতে ভোরবেলায় ঘুম চোখে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে দেখেছি আমাদের সামনের ঘরে বাবার সঙ্গে গল্প করছে রশিদদা আর তরুণ দা। একজন রাজমিস্ত্রি,  অপরজন জোগাড়ে। তারা খাটতে পারতো খুব। কিন্তু একদম দক্ষ ছিল না। ফলে প্রায়ই তাদের কাজের অভাব ঘটতো। যেদিনই তারা কাজ পেতো না, সলজ্জ মুখে, খুবই কুন্ঠিত ভাবে বাবার কাছে তারা চলে আসত। এনারাও বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়নি। স্নেহের আশীর্বাদ এর হাত রাখত তাদের কাঁধে। গল্প করত। নিচু গলায় মার কানে কানে বলে উঠতো, আজ চালটা বেশি করে নিও। আর কয়েকটা ডিম। ওরা এখানেই খেয়ে যাবে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, এই কথাগুলো রূপকথার মত লাগছে বা লাগবে হয়তো। কিন্তু এই রূপকথার বাতাবরণে আমি বড় হয়ে উঠেছি। আমার বাবাকে বিকেল খুব টানতো। তাই আমি বাবাকে বিকেলের কবি বলে সম্বোধন করতাম। বিকালই তো শিশু কিশোরের জিয়নকাঠি, হোমোলুডেন্স এর সারকথা। তাই পিতৃ তর্পণ এর এই মহা লগ্নে, স্মরণ করি, প্রতীক্ষা করি সেই মহান অপরাহ্নের, যেখানে অপেক্ষা করব বাবা ওই পারে তোমার জন্য ! কারণ আজও বৃষ্টি থামেনি।
 তবু বাবা, আজ তোমার প্রতি আমার এক গভীর অভিযোগ আছে।
তুমি আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছ। মূল্যবোধ শিখিয়েছ। কিন্তু আত্মরক্ষা শেখাওনি। তুমি শেখাওনি এই পৃথিবী শুধু আদর্শে চলে না। সমাজ কেবল নৈতিকতায় দাঁড়িয়ে থাকে না। এই পৃথিবী ভীষণ ভারী, ভীষণ নিষ্ঠুর। সেখানে টিকে থাকতে হলে শুধু আলো নয়, অন্ধকারও চিনতে হয়।
তুমি আমাকে ঢাল দাওনি, তরোয়াল দাওনি। প্রস্তুত না করেই চলে গেলে। রেখে গেলে শুধু আশীর্বাদ। হয়তো সেই আশীর্বাদেই আজও ভেঙে পড়েও বেঁচে আছি।
আমি বিশ্বাস করি !  মানুষের ভেতরের অন্ধকার লড়াই করেই দূর করতে হয়। সবাই জন্মসূত্রে সদ্‌গুণ নিয়ে আসে না। কিন্তু লড়াই করলে রত্নাকর থেকে বাল্মিকী হওয়া যায়। এগুলো লিখছি কেন জানি না। হয়তো এটা আমার আত্মহনন, আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মগ্লানি।
আজ বুঝি !শুধু শিক্ষিত, মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবার হলেই যথেষ্ট নয়। সন্তানকে বাস্তববাদী করে তুলতে হয়। আমার পরিবার ছিল ভীষণ শিক্ষিত, জেঠু কাকু সবাই অধ্যাপক, কাকিমারা শিক্ষিকা। তারা স্নেহ দিয়েছেন প্রশ্রয় দিয়েছেন, যদিও মা শাসন করেছেন, কিন্তু বাস্তবকে চেনাননি তারা ছিল আবেগপ্রবণ, মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট ! আদর্শে উজ্জ্বল, বাস্তবে অসহায়।
এই আদর্শবাদী শিক্ষক বাবা জেঠু কাকা আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, কিন্তু বাঁচতে শেখায়নি। সমাজের সঙ্গে লড়াই করার কৌশল শেখায়নি। আজ আমি তারই খেসারত দিচ্ছি।
তবু শেখার কোনো বয়স নেই। বাবার পাঠের বাইরেও আজ আমি শিখছি !  সীমা টানতে, নিজেকে রক্ষা করতে, আলো ও অন্ধকার দুটোই একসঙ্গে দেখতে। হয়তো এই শিক্ষাই আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি পাঠ।


এ জাতীয় আরো খবর