হাদীর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরে জমে থাকা নৈতিক অবক্ষয়ের এক রক্তাক্ত প্রকাশ। গুলি”র” যে ট্রিগার টেনেছে, তা কোনো বিদেশির আঙুলে ছিল—এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু যে পরিবেশে সেই গুলি ছোড়া সম্ভব হয়েছে, সেই পরিবেশ নির্মাণে আমরা সবাই কমবেশি দায়ী। প্রশ্নটি তাই কেবল ,হত্যাকারী কে?
এখানে থেমে থাকলে চলবে না; প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কেন এমন একজন কণ্ঠকে হত্যা করা সম্ভব হলো।
হাদী ছিলেন অস্বস্তিকর এক মানুষ। তিনি সেই রাজনীতির সন্তান নন, যেখানে বংশ, পেশিশক্তি আর অর্থই পরিচয়ের শর্ত। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন ভিন্ন জায়গায়—সাধারণ জীবনের ভিতর দাঁড়িয়ে অসাধারণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বলেছিলেন। সংসদে যেতে চেয়েছিলেন জনতার কথা বলার জন্য, নীতিনির্ধারণের জায়গায় থাকতে চেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায়। এমপি হওয়াকে তিনি ক্ষমতার চূড়া ভাবেননি; বরং রাষ্ট্রচিন্তার একটি সিঁড়ি হিসেবে দেখেছিলেন। এই স্পষ্ট উচ্চারণই তাকে বিপজ্জনক করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কীভাবে তাকে পরিকল্পিতভাবে ছোট করার চেষ্টা হয়েছিল। প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল—তিনি আগে কাউন্সিলর ছিলেন কি না, তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আছে কি না, তিনি কেন আট আসনে নির্বাচন করতে চান। এসব প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক পুরনো রাজনীতির অহংকার: রাজনীতি কেবল তাদেরই অধিকার, যারা আগে থেকেই ক্ষমতার বলয়ে ঘোরাফেরা করে। হাদীর উত্তর ছিল সহজ কিন্তু বিধ্বংসী—তিনি জনগণের কথা বলতে চান, নীতি তৈরির জায়গায় থাকতে চান। এই উত্তর ক্ষমতার অলিন্দে প্রতিধ্বনি তুলেছিল, আর সেই প্রতিধ্বনিই ভয় হয়ে ফিরে এসেছিল।
হাদী জানতেন, তার প্রকৃত শত্রু কারা। তিনি কোনো অস্পষ্ট বহিঃশক্তির কথা বলেননি; তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছিলেন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের দিকে—যারা নির্বাচনকে পুঁজি আর পেশির হিসাবের খাতায় নামিয়ে এনেছে। তিনি বলেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, প্রথম আলোর চেয়েও বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন ,তিনি পত্রিকা অফিস ভাঙচুর,জ্বলাও পোড়াও,ধ্বংসের এর কথা বলেন নি । এই বক্তব্যে অনেকেই অহংকার দেখেছেন, কিন্তু আসলে এটি ছিল এক বিকল্প রাষ্ট্রকল্পনার ইঙ্গিত—যেখানে ক্ষমতা মানে দখল নয়, বরং প্রভাব মানে দায়বদ্ধতা।
হাদীর জীবনযাপন ছিল তার রাজনীতির মতোই স্বচ্ছ ও সাধারণ। তিনি জানতেন, এই দেশে ভয়হীন কণ্ঠ দীর্ঘজীবী হয় না। তবু তিনি নিরাপত্তার বর্মে নিজেকে মুড়ে ফেলেননি। সাধারণভাবে চলাফেরা করেছেন, মানুষের ভিড়েই থেকেছেন। এই সরলতাই তার শক্তি ছিল, আবার এই সরলতাই রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মুখে তাকে নগ্ন করে দিয়েছিল।
এখানেই ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রশ্ন আসে। বিদেশি শক্তি ষড়যন্ত্র করতেই পারে—ইতিহাস তার প্রমাণে ভরা। কিন্তু ষড়যন্ত্র তখনই সফল হয়, যখন দেশের ভেতরে তার জন্য উর্বর জমি তৈরি থাকে। যদি আমাদের রাজনীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্থলোভী ও ক্ষমতালোভীদের উৎপাদন করে, যদি নির্বাচন মানেই টাকা ও পেশিশক্তির উৎসব হয়, যদি ক্ষমতা হারানোর ভয়ে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রাখে—তাহলে বাইরের শক্তির খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন পড়ে না।
হাদীর মৃত্যু তাই একক কোনো শক্তির কাজ নয়; এটি একটি ব্যবস্থার ফসল। যে ব্যবস্থা সাহসী কণ্ঠকে পুরস্কৃত করে না, বরং শাস্তি দেয়। যে ব্যবস্থা প্রশ্নকে সহ্য করতে পারে না, বরং প্রশ্নকারীকে নিশ্চুপ করে দিতে চায়। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কেবল বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
হাদীকে যারা হত্যা করেছে, তারা হয়তো ভেবেছে—একটি কণ্ঠ থামিয়ে দিলে ঝুঁকি কমবে। কিন্তু তারা ভুল করেছে। কারণ কিছু মৃত্যু থামিয়ে দেয় না, বরং প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তোলে। হাদীর মৃত্যু আমাদের সামনে সেই প্রশ্নই রেখে গেছে—আমরা কি রাজনীতির ঘরের ভেতরে লালিত দেশীয় শত্রুদের চিহ্নিত করতে প্রস্তুত, নাকি আবারও দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বিবেকের কাছে পরাজয় স্বীকার করব?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, হাদীর মৃত্যু একটি অর্থহীন ট্র্যাজেডি হয়ে থাকবে, নাকি একটি অনিবার্য পরিবর্তনের সূচনা হয়ে উঠবে। রাষ্ট্র যন্ত্র কাজ করে নিজস্ব বলয়ে গতিতে। এই যন্ত্রের স্টিয়ারিং যার হাতে ,সেই বিবেক যদি শুদ্ধ হয়,নির্ভিক হয়,দেশ প্রেমী হয়, শুয়োরের মত নয় বাঘের মত ক্ষিপ্র আর তীক্ষ্ন হয়, সর্পোরি সুস্থ্য বিবেকের হয় এ দেশে থেকে বৈষম্য দূর করা অস্বাভাবিক নয়,হাদিরাই কাজ করতে পারবে দেশের জন্য।তাই হাদির খুনিদের শুধু দেশের বাইরে নয়,দেশের ভিতর,তার সংগঠনের ভিতর,তার চারপাশে,আসে পাশে সবখানেই গোয়েন্দা তৎপরতায় খোঁজা উচিত। কারণ বন্ধুকের গুলির ট্রিগার ছিল এই বাংলাদেশের। বাংলাদেশের মস্তিষ্ক আর কত বার ঝাঁজরা হবে ,বাংলাদেশের বুক আর কত ক্ষত বিক্ষত হবে,আর কত মায়ের বুক খালি হবে ,আর কত স্ত্রী হারাবে স্বামী,আর কত সন্তান হবে এতিম,অনাথ। ক্ষুদিরাম,ভগৎসিং,হাদিদের জন্ম হয় কালে ভদ্রে, মিরাকলে। আমাদের সিস্টেম ,তেলবাজি,সুদূরপ্রসারি আগ্রাসন। দেশি- বিদেশী শক্তি এদের বাঁচতে দেয় না।