আজ (বৃহস্পতিবার) জাতীয় প্রেসক্লাবে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আয়োজিত ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সকল রাজনীতিবিদের সদিচ্ছা জরুরি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজি) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, “প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছেন বা পঙ্গু হচ্ছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু ব্যক্তি ও পরিবার নয়, গোটা সমাজ ও অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
নিসচার ভাইস-চেয়ারম্যান লিটন এরশাদের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভুঁইয়া, ডিআরইউয়ের সাবেক সভাপতি মোরসালিন নোমানী, সিনিয়র সাংবাদিক শাহাবুদ্দিন শিকদার।
স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন নিসচা মহাসচিব এস এম আজাদ হোসেন।স্বাগত বক্তব্যে তিনি উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে বলেন,সড়ক দুর্ঘটনা রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি।
তিনি বলেন,বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।এতে বছরে প্রাণ হারান কয়েক হাজার মানুষ।আহত ও পংুত্ব বরণ করেন প্রায় অর্ধালক্ষাধিক-এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, এক বা একাধিক ভাঙা স্বপ্ন। অথচ দুর্ঘটনার খবর আমরা এখন এমনভাবে গ্রহণ করি, যেন এটি দেশের নিত্যদিনের রুটিন। বাস্তবতা হলো, সড়কে মানুষ মারা যাচ্ছে শুধু চালকের বেপরোয়া আচরণে নয়, বরং আমাদের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতায়।
তিনি বলেন,বাংলাদেশে সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে প্রতিটি সরকার বড় বড় ঘোষণা দেয়-ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, টোল হাইওয়ে-এসব প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু প্রাণহানি কমেনি। কেন? কারণ আমাদের রাজনীতি এখনো ‘রোড সেফটি’কে ভোটের ইস্যু হিসেবে দেখেনি। দলীয় প্রতিশ্রুতির তালিকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষির মতো সড়ক নিরাপত্তা জায়গা পায় না। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর যত মানুষ মারা যায়, তা ডেঙ্গু, আগুন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে বেশি।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা মানে কেবল নতুন আইন প্রণয়ন নয়-বরং কঠোর প্রয়োগ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, বড় দুর্ঘটনার পর কিছুদিন শোক আর ক্ষোভের আবহে সরকার বা দলীয় নেতা-মন্ত্রীরা আশ্বাস দেন, তারপর সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষাকে প্রাথমিক স্তর থেকেই পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যেত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালু করা যেত। অথচ আজও অনেক চালক বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই বড় যানবাহন চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর যদি সত্যিকারের সদিচ্ছা থাকত, তবে তারা এমন নীতিমালা করতেন, যেখানে লাইসেন্স দেওয়া হতো না ঘুষে, বরং দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে।
তিনি বলেন,বাংলাদেশের পরিবহন খাত আসলে একধরনের অঘোষিত রাজনৈতিক সাম্রাজ্য। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে দলীয় কাঠামোর ভিত নাড়া দেওয়া। এই বাস্তবতায় কোনো সরকারই কঠোর হতে পারে না, কারণ সড়কই এখন রাজনীতির অর্থনৈতিক শিরা।
তবে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে সর্বদলীয় সমঝোতা প্রয়োজন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি 'জাতীয় রোড সেফটি কমিশন' গঠন করতে হবে, যার কাজ হবে-সড়ক আইন বাস্তবায়ন, যানবাহন মান নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা পরবর্তী তদন্ত নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন,রাজনৈতিক দলগুলো যদি চায়, তাহলে সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করা সম্ভব। যেমন তারা মশা নিধন, পরিবেশ রক্ষা বা নির্বাচনী প্রচারণায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও করতে পারে। প্রতিটি দল যদি তাদের যুব সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও স্থানীয় কমিটিগুলোর মাধ্যমে 'সচেতন চালক–নিরাপদ সড়ক' ক্যাম্পেইন চালায়,তবে এর প্রভাব হবে ব্যাপক।
এক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মগুলোও কাজে লাগানো যেতে পারে। জুমার খুতবা, টেলিভিশন নাটক, সামাজিক মাধ্যম-সবখানেই যদি বার্তা যায় 'প্রতি জীবন মূল্যবান', তাহলে দুর্ঘটনা শুধু সংখ্যা নয়, একটি বিবেকের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধের মূল চাবিকাঠি প্রযুক্তি নয়,আইনও নয়-এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একটি সরকার বা রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই চায়, তাহলে এক দশকের মধ্যেই দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। উদাহরণ আছে-সুইডেন, জাপান, এমনকি নেপালও তা প্রমাণ করেছে।
তাই সময় এসেছে আমাদের রাজনীতিকদের নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার:
'ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, প্রাণ বাঁচানোর জন্য কাজ করব।'
একটি নিরাপদ সড়ক শুধু মানুষের জীবন রক্ষা করে না-এটি দেশের অর্থনীতি,সংস্কৃতি ও মানবিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে একটিমাত্র জিনিস-'রাজনৈতিক সদিচ্ছা'।
দেশব্যাপী নিসচা শাখাগুলি মাসব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন,উল্লেখ করে তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন,আপনাদের মাধ্যমে দেশের মানুষ আমাদের কর্মকান্ড জানতে ও দেখতে পারছেন।এতে একজন মানুষও যদি সড়কে সচেতন হয়,একটি জীবনও যদি বাঁচে সেটিও কম না।
নিরাপদ সড়ক চাইয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় কানাডা থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে নিসচার মাসব্যাপী কর্মকান্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন সেই সাথে লন্ডনে চিকিৎসাধীন নিসচা প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চনের সর্বশেষ শারিরীক অবস্থাও তুলে ধরেন ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কাদের গনি জানান, বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৩৮০ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ৪৪৬টি দুর্ঘটনায় ৪১৭ জন নিহত ও ৬৮২ জন আহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির প্রায় দেড় শতাংশ।
বিএফইউজের মহাসচিব জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের জন্য সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও সাধারণ মানুষ তা জানেন না। আইন অনুযায়ী নিহতদের পরিবার ৫ লাখ টাকা, অঙ্গহানিতে ৩ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহতদের সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা সহায়তা পাওয়ার কথা।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হয়, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন সময়সীমা ৯০ দিন করার জন্য।
কাদের গনি আরো বলেন, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নসিমন-করিমনসহ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বেআইনি হলেও তা পুলিশের চোখের সামনে চলছে। ২০১৭ সালে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকলেও এখনো এসব যান রাস্তায় চলছে। ফলে হঠাৎ গলির ভিতর থেকে হাইওয়েতে উঠে আসা যানগুলোই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
তিনি উল্লেখ করেন, বিআরটিএ বলছে দেশে ছয় লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে, কিন্তু বাস্তবে সংখ্যা আরও বেশি। উৎসবের সময় পুরনো গাড়ি গ্যারেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়, অধিক অর্থ পাওয়ার আশায় চালকরা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান। এতে বিশেষ করে ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।
কাদের গনি বলেন, বাংলাদেশে পরিবহন খাতকে এখনও শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ফলে চালকদের নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা ও বেতন-ভাতা নির্ধারিত নয়। ট্রিপভিত্তিক আয়ের কারণে চালকেরা অতিরিক্ত কাজ করেন, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন এবং তখনই দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি জোর দেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকার, পরিবহন মালিক, চালক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজ একসাথে কাজ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করা, রোড ডিভাইডার স্থাপন, রাস্তা মেরামত, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই বিষয়গুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন-যুগ্ম মহাসচিব মোঃ গনি মিয়া বাবুল, একে আজাদ, অর্থ সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৫ উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মোঃ কাইয়ুম খান সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল হোসেন খান, আইন বিষয়ক সম্পাদক এড. দীপক কুমার সরকার,প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক,কার্যনির্বাহী সদস্য যথাক্রমে নাসিম রুমি, আসাদুর রহমান, মোঃ শফিকুল ইসলাম ও মোঃ কামরুজ্জামান,কল্পনা রানী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব তৌফিক আহসান টিটু,শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহমান এবং পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন সদস্য আব্দুল মান্নান।