দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। গতকাল শনিবার (২৮ জুন) দেশের ছয়টি ভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের নেতা, যারা ঢাকায় দলীয় মহাসমাবেশে যোগ দিতে আসার পথে প্রাণ হারান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী, প্রবাসফেরত যুবক, স্কুল শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা-দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে নানা পেশার মানুষের প্রাণ।
মুন্সীগঞ্জে ভয়াবহ দুর্ঘটনা: ইসলামী আন্দোলনের চার নেতার মৃত্যু
শনিবার ভোরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগর অংশে একটি নাইট কোচ চলন্ত ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত চারজনই যশোর জেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন-ইসলামী আন্দোলন যশোর জেলার সভাপতি ডা. জালাল উদ্দিন, ঘুরুলিয়া গ্রামের মাওলানা মোস্তফা কামাল ও রওশন আলী, এবং আড়পাড়া গ্রামের জিল্লুর রহমান।
দলটির যশোর জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন জানান, তাঁরা দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কোচটি প্রথমে একটি ট্রাককে ধাক্কা দেয় এবং পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের রেলিংয়ে গিয়ে আটকে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।
যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু
ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ইসরাত জাহান করবী (২৩) মারা যান। তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন তাঁর বন্ধু রাফি (২৫), যিনি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন।
সৌদিফেরত যুবকের প্রাণ গেল নবাবগঞ্জে
ঢাকার নবাবগঞ্জে শুক্রবার রাতে সৌদি ফেরত প্রবাসী যুবক মেহেদী হাসান (২৬) এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। দুর্ঘটনাটি ঘটে নিমতলা বাজার এলাকায়। তার সঙ্গে থাকা তামিম ও হাসান নামের দুই বন্ধু আহত হন। মেহেদী মাত্র দেড় মাস আগে সৌদি আরব থেকে ছুটিতে এসেছিলেন।
কুষ্টিয়ায় পুলিশ কনস্টেবলের করুণ মৃত্যু
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে শনিবার সকাল ১০টার দিকে দায়িত্বরত অবস্থায় হাফিজুর রহমান নামের এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি ট্রাক ও বাসের মাঝে পড়ে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন বলেন, “কনস্টেবল হাফিজুর দায়িত্ব পালনের সময়ই মারা যান।”
জামালপুরে স্কুল শিক্ষকের প্রাণহানি
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে শনিবার সকালে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় স্কুলশিক্ষক আতাউর রহমান (৫০) নিহত হন। তিনি পোল্লাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। দুর্ঘটনাটি ঘটে পোল্লাকান্দি ব্রিজের কাছে।
চট্টগ্রামে জামায়াত নেতার মৃত্যু
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে শুক্রবার দিবাগত রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় ইলিয়াস (৬০) নামের এক জামায়াত নেতার মৃত্যু হয়। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। নিহত ইলিয়াস ফটিকছড়ির বাসিন্দা।
শরীয়তপুরে বৃদ্ধ নিহত, আহত ৩
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় ভ্যান ও পিকআপের সংঘর্ষে আশরাফ আলী দর্জি (৭০) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হন। দুর্ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। হতাহতরা সবাই গোসাইরহাট উপজেলার গরিবের চর এলাকার বাসিন্দা।
প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু গতকালই একাধিক জেলার বিভিন্ন সড়কে ১১ জনের মৃত্যু ও বহু মানুষের আহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুতগতির যানবাহন, চালকদের অবহেলা, রাস্তার নিরাপত্তাহীনতা এবং নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহন ব্যবস্থাই এসব মৃত্যুর মূল কারণ।
নিরাপদ সড়কের জন্য সামাজিক আন্দোলন, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চালকদের প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।