মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

হালুয়াঘাটে শিশুপুত্রকে শাবল দিয়ে হত্যা: ঘরের মেঝে খুঁড়ে উদ্ধার মরদেহ,আটক বাবা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক,
  • ২০২৫-০৬-১৯ ১৪:২৬:০৭
ছবি সংগৃহিত

ময়মনসিংহ | ১৯ জুন ২০২৫
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় মাত্র দুই বছরের শিশুপুত্রকে শাবল দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছেন এক বাবা। হত্যার পর নির্মমভাবে শিশুর মরদেহ নিজের ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখেন তিনি। বুধবার (১৮ জুন) গভীর রাতে পুলিশ গর্ত খুঁড়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
নৃশংস এই ঘটনার পর অভিযুক্ত বাবা নুরুল আমিন (৩০)-কে আটক করেছে পুলিশ। নিহত শিশুর নাম আইয়ুব আলী। সে উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম ধুরাইল গ্রামের বাসিন্দা এবং নুরুল আমিন ও জেসমিন আক্তারের একমাত্র সন্তান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকাল ৩টার দিকে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন নুরুল আমিন। স্ত্রী জেসমিনকে মারধর করে এবং শিশু আইয়ুবকে টেনে-হিঁচড়ে নিজ ঘরে নিয়ে যান। এরপর চার ঘণ্টার বেশি সময় দরজা বন্ধ রেখে কাউকে ঘরের কাছে আসতে দেননি। পাশে এলেই মেরে ফেলার হুমকি দেন, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও ভয়ে পাশের বাড়িতে সরে যান।
সন্ধ্যার পরেও শিশুর কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে এলাকাবাসীর সহায়তায় পরিবারের লোকজন ঘরে প্রবেশ করে খোঁজ শুরু করে। একপর্যায়ে ঘরের এক কোণে মাটি খোঁড়ার চিহ্ন দেখে সন্দেহ হলে নুরুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নৃশংস হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।
শুধু শিশুপুত্র নয়, ঘরের দুটি ছাগলকেও হত্যা করে একই গর্তে পুঁতে রাখেন নুরুল আমিন। বিষয়টি জানান তার ভাবি আমেনা বেগম। তিনি বলেন, “বিকেলে এসে দেখি ঘরে দরজা বন্ধ। ভেবেছিলাম হয়তো বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। পরে দেখি না বাচ্চা আছে, না কোনো শব্দ। পরে জানতে পারি, সে নিজের ছেলেকে ও দুটি ছাগল মেরে পুঁতে রেখেছে।”
স্থানীয়রা জানান, নুরুল আমিন দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অতীতে তিনটি বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু তার মানসিক আচরণের জন্য সব স্ত্রীই তাঁকে ছেড়ে চলে যান। জেসমিনের সঙ্গে তার বর্তমান সংসার এবং সেই ঘরেই জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান আইয়ুব।
এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “এই সন্তানটিই ছিল তার জীবনের শেষ আশ্রয়। কিন্তু তাকেও এভাবে খুন করল! এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
ঘটনার পরপরই হালুয়াঘাট থানা পুলিশ রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেঝে খুঁড়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। শিশুটির মাথা ও কানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে বলে নিশ্চিত করে পুলিশ। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সাগর সরকার বলেন, “ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। প্রাথমিকভাবে ধরা পড়া নুরুল আমিন মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
তিনি আরও জানান, অভিযুক্তের মানসিক অবস্থান যাচাই করে প্রয়োজন হলে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হবে এবং মামলা দায়েরসহ আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
এই নৃশংস ঘটনার পর এলাকায় চরম শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই নুরুল আমিনের অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়ছিল, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অভাবে কেউ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। বিষয়টি গ্রামবাংলার পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অনীহা ও উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি বলেও মত দিয়েছেন অনেক সচেতন নাগরিক।
শিশু হত্যার মতো নির্মম ঘটনা দেশের বিচার ও মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানকে এমনভাবে হত্যা করতে পারে-এটি যেমন মানবিক বোধে আঘাত করে, তেমনি প্রশ্ন তোলে সমাজের নীরবতার ওপরও। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় কি না।

 


এ জাতীয় আরো খবর