রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬

ঈদযাত্রায় মৃত্যু ও ভোগান্তির মিশেল: ১৫ দিনে প্রাণ গেল ৪২৭ জনের, আহত ১১৯৪ জন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক,
  • ২০২৫-০৬-১৬ ১৫:০৪:০০
ছবি সংগৃহিত

ঢাকা-১৬ জুন ২০২৫
ঈদুল আজহা ঘিরে দেশের মানুষ যখন প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত, তখন সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘটেছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার এক নির্মম চিত্র। ঈদের আগে ও পরে মোট ১৫ দিনে মোট ৪১৫টি দুর্ঘটনায় ৪২৭ জন নিহত এবং ১১৯৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়কপথে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত এবং ১১৮২ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বেপরোয়া চালনা, যানবাহনের ফিটনেস ঘাটতি, মহাসড়কে ছোট যানবাহনের চলাচল এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনের প্রবণতা চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঈদের সময়টিতে রেলপথকেও নিরাপদ মনে না হওয়ার মতো চিত্র উঠে এসেছে। ১৫ দিনে ২৫টি রেল দুর্ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঈদযাত্রায় ১১টি নৌ দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু এবং ৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এর পেছনে মূলত অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও ঘনবৃষ্টিতে নৌযান নিয়ন্ত্রণ হারানো অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “যতবারই ঈদ আসে, ততবারই একই সমস্যা। দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থাপনা-এগুলো যেন নিয়তির মতো মেনে নিতে হয়। অথচ চাইলে আমরা একটি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে পারি।”
তিনি বলেন, ঈদের সময় যাত্রার চাপ সহ্য করতে হলে গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ, সড়ক সংস্কার, এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ঈদের আগে ভারী বৃষ্টির কারণে সড়কে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। এই গর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বহু যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়।
ঈদের পর চালকদের বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘক্ষণ চালনার কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া, সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক কিংবা বাসের পেছনে ধাক্কা দিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
এবারের ঈদেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং যাত্রী হয়রানির চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। মোজাম্মেল হক জানান, “ভাড়ার নামে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে চরমভাবে অর্থ আদায় করা হয়েছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাস-ট্রেনের ছাদ, এমনকি পণ্যবাহী ট্রাকেও যাত্রা করেছেন।”
তিনি বলেন, “দরিদ্র মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরেছেন, কারণ অন্যথায় ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করা অসম্ভব হয়ে যেত।”
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে, ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও ভোগান্তিমুক্ত করতে চাই দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। তাদের সুপারিশ:
ঈদের আগে কমপক্ষে ৪ দিনের ছুটি ঘোষণা করা
ছোট যানবাহন মহাসড়ক থেকে উচ্ছেদ
ফিটনেসবিহীন যান চলাচল নিষিদ্ধ
দক্ষ চালক গড়ে তোলা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং সেল
এবং জনগণকেও সচেতন হওয়া ও সহনশীলতা বজায় রাখা
ঈদের আনন্দ কতটা বিষাদে রূপ নেয়, তা বোঝা যায় এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। কেবল ছুটির আনন্দ নয়, জীবন রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যুগোপযোগী পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যথায়, ঈদে ঘরে ফেরা মানুষগুলোর কারও কারও আর ফেরাই হয় না।

 


এ জাতীয় আরো খবর