মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

আসাম থেকে ‘বিদেশি’ তকমায় বাংলাদেশে পুশব্যাক: প্রশ্নের মুখে ভারতীয় মানবাধিকার বাস্তবতা

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৬-১১ ২৩:২০:৫৭
ছবি সংগৃহিত

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘বিদেশি বিতাড়ন’ নীতির বিতর্ক। বিশেষ করে ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মুসলিম বাঙালিদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে। শুধু উদ্বেগ নয়-তারা এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
রয়টার্স ও টেলিগ্রাফের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত ৩০৩ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছে আসাম রাজ্য প্রশাসন। এদের সিংহভাগই মুসলিম, যাদের বেশিরভাগই আসামের স্থায়ী বাসিন্দা, বহু দশক ধরে বসবাসকারী পরিবার এবং জমির মালিকও।
সরকারের দাবি-তারা ‘বিদেশি ট্রাইব্যুনালের রায় অনুসারে’ কাজ করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব ট্রাইব্যুনাল অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট এবং ন্যায্য আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে অনেক নিরীহ মানুষ ভুলবশত “বিদেশি” হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন।
৫১ বছর বয়সী প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক খাইরুল ইসলাম এই বিতাড়ন প্রক্রিয়ার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। ২০১৬ সালে এক ট্রাইব্যুনাল তাকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করে। জামিনে মুক্তি পেলেও ২৩ মে পুলিশ হঠাৎ করে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, চোখ ও হাত বেঁধে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আরও ১৩ জনের সঙ্গে।
বাংলাদেশি গ্রামবাসীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ রেখে দেয়। স্ত্রী পুলিশের কাছে জানালে খাইরুলকে ফেরত নেওয়া হয়-কিন্তু বাকিদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় বলেন, “বিদেশিদের বিতাড়নে সুপ্রিম কোর্টের চাপ রয়েছে। আমরা আরও তীব্রভাবে এই কাজ চালিয়ে যাব। রাজ্যকে রক্ষার জন্য এটা জরুরি।”
এমন বক্তব্য আসামের বহু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের রাজনৈতিক আবেগকে উসকে দেয়। তারা মনে করে, বাঙালি মুসলিমরা চাকরি, জমি ও নাগরিক সুবিধায় অসমিয়াদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বিতাড়ন অভিযানের সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বহু ‘বিদেশি ঘোষিত’ ব্যক্তি ভারতেই জন্মেছেন, বসবাস করছেন এবং কোনো রকম বিদেশি সংযোগ নেই। তাদের ন্যূনতম আইনি সহায়তা বা উচ্চ আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, ফলে তারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বলি হচ্ছেন।
“ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে একজন নাগরিককে তার দেশ থেকে বহিষ্কার করা মানবাধিকারের পরিপন্থি, এটি আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ”-বলেছেন দিল্লির অধিকারকর্মী সঞ্জয় কুমার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, “ভারত থেকে কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।” তবে এখনো এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি বা প্রতিরোধমূলক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা আসেনি।
বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরাও সীমান্তে ‘অবাঞ্ছিত পুশইন’ প্রতিহত করতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বিষয়টিকে ঘিরে সতর্ক বার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের বিতাড়ন কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি একটি আঞ্চলিক মানবিক সংকটের ইঙ্গিত।
এছাড়া আশঙ্কা রয়েছে, নাগরিকপঞ্জির (NRC) ভবিষ্যৎ প্রয়োগেও এই বিতাড়নের দৃষ্টান্ত ব্যবহার করে আরও বহু নিরীহ মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
ভারতের সংবিধান নাগরিকদের ধর্ম ও ভাষাভিত্তিক বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু আসামের ‘বিদেশি’ বিতাড়ন প্রক্রিয়া এখন প্রশ্ন তুলছে সেই সংবিধানের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েই।
যে মানুষ নিজের দেশেই প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন যে তিনি সে দেশের নাগরিক-তার জন্য রাষ্ট্র কেমন? সেই প্রশ্ন জেগে ওঠে খাইরুলদের চোখের জল, স্ত্রীর আকুতি আর ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’-এ আটকে থাকা অসংখ্য আত্মার আর্তনাদে।

 


এ জাতীয় আরো খবর