বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং জলবায়ু-সংকটকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে উঠে এসেছে গুরুতর হুঁশিয়ারি ও বিকল্প ভাবনার এক চিত্রপট।
সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় 'The July Revolution and Beyond: Rethinking Security, Sustainability and Peace in South Asia' শীর্ষক সেমিনার। আয়োজক ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।
“ভারত পানি দেবে না, নিতে গেলে যুদ্ধ করতে হবে”-মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান
সেমিনারে মূল বক্তব্য প্রদান করেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান। তিনি সরাসরিভাবে বলেন,
“ভারত অভিন্ন নদীতে সাড়ে চার হাজারের বেশি বাঁধ নির্মাণ করেছে। আমি নিশ্চিত, তারা আমাদের পানি দেবে না। নিতে গেলে প্রস্তুত থাকতে হবে যুদ্ধের জন্য।”
তিনি বলেন, পানিকে আশীর্বাদে রূপান্তর না করলে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বন্যার ক্ষতি রূপান্তরযোগ্য সম্ভাবনায় পরিণত করার জন্য ‘ইমারত মডেল’ নামের একটি ব্যতিক্রমী ধারণা তুলে ধরেন ফজলুর রহমান।
এই মডেল অনুসারে-
নিচু জমিতে উঁচু ভবন নির্মাণ করে নিচতলা ফাঁকা রাখা যাবে।
বন্যার পানি ব্যবহার করে মাছ চাষ করা যাবে।
পানি ধরে রেখে কৃষিকাজের জন্য সেচে ব্যবহার করা সম্ভব।
এমনকি ফ্লাড-ট্যুরিজমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা যাবে।
তিনি বলেন, “যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে পুরো দেশকে কানেক্ট করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ আয়বর্ধক দেশে রূপান্তরিত হতে পারে।”
ভারতের ‘পানি আগ্রাসন’কে বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, “হিমালয়ের ড্রেনেজ সিস্টেমের অংশ হিসেবে আমরা পানি পাই, সেই পানি পলি এনে ভূমি তৈরি করে। কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে ধ্বংসের কারণ। সঠিক পরিকল্পনা হলে বন্যা হতে পারে আমাদের উন্নয়নের হাতিয়ার।”
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, “ভারত মনে করে তারা আমাদের স্বাধীন করে আমাদের হাতে দেশ তুলে দিয়েছে। এই ধরনের মনোভাব আমাদের জাতিসত্তাকে আঘাত করে।”
তিনি মূল বক্তার ভূরাজনৈতিক চিন্তা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশকে হুমকির মধ্যেও সম্ভাবনার দেশ হিসেবে দেখার জন্য ফজলুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসনীয়। এই চিন্তাগুলোকে অ্যাকাডেমিয়ার সাথে যুক্ত করতে হবে।”
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “আমরা প্রতিবেশী পাল্টাতে পারব না, কিন্তু সাহস দেখাতে পারি। আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, সাহস হারাবো কেন?”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান সরাসরিভাবে ভারতের ভূরাজনৈতিক বয়ান প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বাইপ্রোডাক্ট নয়। আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা নতুনভাবে নিজেকে চেনার সুযোগ পেয়েছি।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মেজবা-উল-আযম সওদাগর বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে পারে না। ভারত পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছে। এখন সময় এসেছে বিকল্প পরিকল্পনার।”
তিনি ফারাক্কা চুক্তিকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “ভারত নদীর পানি ৪০০টিরও বেশি ক্যানেল দিয়ে সরিয়ে নেয়, আর যে পানি পড়ে থাকে সেটি নিয়ে চুক্তি করে। আমাদের কৌশল পাল্টাতে হবে।”
সেমিনারের আহ্বায়ক ও সঞ্চালক ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, “একাডেমিক চর্চা যদি বাস্তব কৌশলের সাথে যুক্ত না হয়, তাহলে তা সমাজে প্রভাব ফেলতে পারবে না। ফজলুর রহমানের চিন্তা আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।”
সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক নাছিমা খাতুন। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন, অধ্যাপক স ম আলী রেজা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা।