শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

গুজবের উৎসপাঠ: তথ্যযুদ্ধে বাংলাদেশের ভেতরের 'অদৃশ্য শত্রু' কে?

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৫-০৪ ২৩:১০:০৯
ছবি সংগৃহিত

বাংলাদেশের গুজব-সংস্কৃতি নিয়ে যতদিন ভারতকে একমাত্র উৎস ভেবে আলোচনা চলেছে, ততদিন যেন আসল প্রশ্নটাই ঢাকা পড়ে ছিল। কিন্তু তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম রোববার এক বক্তব্যে সেই প্রচলিত বিবরণে ছুরি চালালেন-গুজব আসে শুধু বাইরের নয়, দেশের ভেতরের ‘আনঅ্যাকসেপ্টিং গোষ্ঠী’ থেকেও।
‘ডিজিটাল ভেরিফিকেশন অ্যান্ড ফ্যাক্টচেকিং’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘‘গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এখনও অনেকের গায়ে লেগে আছে। সেটাকে হজম করতে না পেরে দেশে বসেই অনেকে এখন ‘বিকল্প সত্য’ তৈরিতে ব্যস্ত।’’
গুজব এখন ‘পলিটিকাল মিসাইল’: অভ্যুত্থানের পর অপতথ্যের নয়া মুখোশ
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যখন নতুন প্রশাসন ‘সংস্কারপন্থী’ সরকার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, তখন তথ্য উপদেষ্টার এই বক্তব্য একেবারেই তাৎপর্যপূর্ণ।
‘‘অপপ্রচারে এমন আকারে বলা হচ্ছে, যেন কিছুই ঘটেনি। বরং পুলিশ নিপীড়নের শিকার না হয়ে, ছাত্ররাই নাকি পুলিশকে মেরে ক্ষমতা দখল করেছে-এটাই এখনকার গল্প,’’-মাহফুজ আলমের কণ্ঠে এই অভিযোগ শুধু তথ্য-সংকট নয়, বরং ‘ন্যারেটিভ যুদ্ধের’ লক্ষণীয় নমুনা।

ধর্মীয় আবেগের ‘ডিজিটাল অস্ত্রায়ন’ এবং প্রশাসনের দায়িত্ব
তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে স্থানীয় পর্যায়ে অপতথ্য বেশি ছড়ানো হচ্ছে।’’ এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা-সামাজিক স্থিতিশীলতা এখন ডিজিটালভাবে দুর্বল করা সম্ভব।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি সরকারি তথ্য কর্মকর্তাদের সক্রিয় ও কৌশলী ভূমিকার আহ্বান জানান, যেন একটি মিথ্যা পোস্ট গোটা মহল্লাকে অগ্নিগর্ভ করে না তোলে।

২০২৫ নির্বাচন ও ‘সাইবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সতর্ক করেন, ‘‘আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপতথ্য ও সাইবার আক্রমণের মুখোমুখি হতে পারে।’’
এই পূর্বাভাস যেন সতর্ক ঘণ্টা। তথ্য যুদ্ধ এখন আর শুধু “কে আগে খবর দিল” এমন প্রতিযোগিতা নয়-এটি এখন ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের হাতিয়ার।

‘বিব্রত করতে চায় একদল’: তথ্য সচিবের স্পষ্ট বার্তা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে আসে সরাসরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত- ‘‘একদল লোক বসে আছে এই সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে। তারা এত খারাপ কাজ করে গেছে যে এখন সংস্কার কার্যক্রমই তাদের চোখে বিষ।’'
এই বক্তব্য এক অর্থে জবাব হয়ে দাঁড়ায় সেইসব প্রচারণার, যেখানে গত অভ্যুত্থানকে ‘ভুয়া বিপ্লব’ বা ‘কর্মসূচির নামে সহিংসতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

‘তথ্য’ এখন সরকার রক্ষার প্রধান ঢাল?
এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গুরুত্ব এখন অনেক গভীরে গাঁথা। এটা কেবল তথ্য যাচাই শেখানো নয়-এটা ডিজিটাল প্রতিরক্ষা তৈরির প্রথম ধাপ।
একটা সময় ছিল, যখন শত্রুরা বোমা ফেলত, এখন তারা পিক্সেল ও পোস্টে দেশ ভাঙে। সে কারণেই এই প্রশিক্ষণ আর পিএসসি-স্টাইল ফর্মালিটি নয়-এটা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ইনফরমেশন শিল্ড।

সত্যের যুদ্ধ এখন শুরু
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বক্তব্য দিয়ে বোঝা গেল-বাংলাদেশ এখন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, বরং তথ্যের সত্য-মিথ্যার দখল নিয়ে এক কঠিন লড়াইয়ের ময়দানে দাঁড়িয়ে। আর এই যুদ্ধে জিততে হলে পোস্ট, প্রোপাগান্ডা নয়-তথ্য যাচাই আর জনসচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।


এ জাতীয় আরো খবর