সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত কয়েকটি প্রশ্ন ও তীব্র বাক্যবিনিময়ের জের ধরে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে ‘সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের নিজস্ব সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা নেই।
মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে সংস্কৃতি উপদেষ্টা লেখেন, “গতকালের সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিক যে প্রশ্নগুলো করেছেন, তা মাস হত্যাকাণ্ডের অস্বীকৃতি প্রদানের একটি সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা হিসেবে বহু মানুষ দেখেছেন। যারা জুলাই অভ্যুত্থানে স্বজন হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন, বা অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন, তাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো ছিল অত্যন্ত আঘাতমূলক।”
তিনি বলেন, “জুলাইকে অস্বীকার করার প্রয়াস আসলে হত্যার বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। এখনো বিচার হয়নি, মাত্র আট মাস পেরিয়েছে। এমন প্রশ্ন জনতার ‘জুলাই’-কেই অস্বীকার করার কৌশল। আমি উত্তরে ধৈর্য বজায় রেখেছি, কিন্তু প্রতিক্রিয়া তো গণমানুষেরও আছে।”
তিন সাংবাদিক বরখাস্ত: কী ঘটেছিল?
২৮ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৮তম আসরে স্থান পাওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলী’-এর কলাকুশলীদের সঙ্গে ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখাবয়বের মুখোশ, এবং জুলাই-অগাস্ট অভ্যুত্থানে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সাংবাদিক।
বাকবিতণ্ডার মতো পরিস্থিতিতে উত্তেজনার মাত্রা বাড়ে, এবং এই প্রশ্নোত্তর পর্বকে কেন্দ্র করে ফেইসবুক পেইজ ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স (জেআরএ)’ সাংবাদিকদের ছবিসহ পোস্ট করে ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ আহ্বান জানায়।
পরে জানা যায়, দীপ্ত টিভির সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট মিজানুর রহমান, এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি ফজলে রাব্বী, এবং চ্যানেল আই অনলাইনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রফিকুল বাসার—এই তিন সাংবাদিককে বরখাস্ত বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
দীপ্ত টিভি নিজে থেকেই তাদের সংবাদ কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে বলে দাবি করেছে। এটিএন বাংলা কর্তৃপক্ষের বরখাস্তপত্রে অতীতে ‘অফিস শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের’ উল্লেখ রয়েছে, যদিও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ফারুকীর সংবাদ সম্মেলন। চ্যানেল আইও তাদের অফিসিয়াল পেইজে ‘পেশাদারিত্ব প্রদর্শন না করার অভিযোগের তদন্তে’ রিপোর্টার অব্যাহতি পাওয়ার কথা জানায়।
‘মিথ্যা সংযোগ তৈরি না করাই ভালো’
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে ফারুকী বলেন, “কেউ কেউ বলছেন আমাকে প্রশ্ন করায় তাদের চাকরি চলে গেছে-এটি হাস্যকর এবং ভ্রান্ত ধারণা। এটা একান্তই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত। আমি কাউকে ফোন করিনি, কারও চাকরি নিয়ে কোথাও হস্তক্ষেপ করিনি।”
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি যদি কেউ সত্য জানতে চান, সংশ্লিষ্ট চ্যানেলগুলোতে যোগাযোগ করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। অনুমান করে ২+২=৪ মেলানোর চেষ্টা ঠিক নয়।”
সরকারি প্রতিক্রিয়া: কোনো চাপ নেই
এ বিষয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে এক মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, “সরকারি পর্যায় থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম নিজেরাই তাদের সংবাদ কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “দীপ্ত টিভির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক সাংবাদিক গণহত্যা অস্বীকার করে প্রশ্ন তোলেন। তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে না করায় তারা নিজেরা সংবাদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
সমালোচনার মুখে মিডিয়া স্বাধীনতা বনাম পেশাদারিত্ব বিতর্ক
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে দুইধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একপক্ষ বলছে, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, অনেকে প্রশ্ন করছেন—সংবেদনশীল ঘটনাকে অস্বীকার করার মতো উস্কানিমূলক প্রশ্ন আদৌ কি পেশাদার সাংবাদিকতার সীমার মধ্যে পড়ে?
অন্যদিকে কিছু মিডিয়া বিশ্লেষক বলছেন, “কর্মস্থলের এডিটোরিয়াল নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার, তবে একই সঙ্গে মিডিয়া ফ্রিডম ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।”
উপসংহার:
এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মিডিয়া স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীলতা—দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক সমাজের চ্যালেঞ্জ। সরকারের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও, ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, ‘জুলাই’ এখন শুধু একটি ঘটনার নাম নয়, বরং তা একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। সেই চেতনার মুখোমুখি হয়ে মিডিয়ার ভূমিকাও এখন নতুন প্রশ্নের মুখে।