বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬

শ্রদ্ধায় স্মরণ-অভিনেত্রি মিনু রহমান

  • মেসবা খান
  • ২০২৫-০৩-১১ ২০:৫০:৫৭

এ দেশের বাংলা চলচ্চিত্রের ভান্ডারকে অভিনয় নৈপূন্যে যে কয়েকজন বলিষ্ঠ নারী অভিনেত্রি সমৃদ্ধ করেছেন মিনু রহমান ছিলেন নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম।
১৯৭২ সালে ই আর খান পরিচালিত 'দাসী' ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রূপালি ভুবনে তাঁর অভিষেক ঘটে। 
প্রখ্যাত অভিনেত্রি মিনু রহমানের জন্ম ১৯৫০ সালে যশোরের শহরতলীর শেখহাটী গ্রামে। পিতামাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সন্নিকটে এনএম খান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। অল্প বয়সে বিয়ে ও পরবর্তীতে স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে আসার কারণে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।
স্বামীর সাথে ঢাকায় এসে প্রথমে বাসাবো ও পরে কমলাপুরে ভাড়া বাসাতে বসবাস শুরু করেন। মূলত সেখান থেকেই তিনি শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
অভিনয় জীবনে বেতার, টেলিভিশন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও মূলত চলচ্চিত্র অভিনেত্রি হিসেবেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
দীর্ঘ ২৫ বছরের শিল্পী জীবনে তিনি প্রায় ২৫০টিরও বেশি ছায়াছবিতে অভিনয় করেছেন। এছাড়াও অভিনয় করেছেন প্রচুর সংখ্যক রেডিও, টিভি ও মঞ্চ নাটকে।
অভিনয় জীবনের শুরুতে কয়েকটি নায়িকার রোল পেলেও পরবর্তীতে তিনি পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন।  পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর অধিকাংশ ছবিতে মিনু রহমান অভিনয় করেছেন।
তাঁর অভিনীত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হলো - কে আসল কে নকল, ঝড়ের পাখি, সৎভাই, আমার জন্মভূমি, পায়ে চলার পথ, লাভ ইন সিমলা, সুজন সখি, মাস্তান, দোস্ত দুশমন, সারেং বৌ, রূপালি সৈকতে, মহানগর, আশার আলো, দহন, রাঙাভাবি, সোনার সংসার, ত্যাগ প্রভৃতি। 
অভিনয়ের কাজে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলি দেশসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। 
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে লন্ডনে 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' মঞ্চ নাটকে আলেয়ার চরিত্রে অভিনয় করে ভূয়সি প্রশংসা অর্জন করেছিলেন তিনি।
মিনু রহমান জীবনের অধিকাংশ সময় অভিনয়ের জন্য ব্যয় করলেও জাতীয় পুরস্কারের দেখা মেলেনি তাঁর। 
অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের 'বৈকুন্ঠের উইল' উপন্যাস অবলম্বনে নায়করাজ রাজ্জাকের 'সৎভাই' ছবিতে তাঁর মনোমুগ্ধকর অভিনয় উপহার দেওয়ায় জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনিত হলেও 'ফিল্ম পলিটিক্স' এর কারণে শেষ পর্যন্ত তা না পাওয়ায় তিনি মানষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। 
পরবর্তী কালে কতকটা নীরব অভিমানেই ১৯৯০ সালের পর থেকে ক্রমেই পর্দার অন্তরালে চলে যান। 
মিনু রহমানের বিবাহিত জীবনের শুরু হয় ১৯৬৮ সালে সৈয়দ শফিকুর রহমানের সাথে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী। বড় মেয়ে হেলেনা, এক মাত্র পুত্র লিটন ও ছোট মেয়ে স্বেতা।
শেষ জীবনে তিনি বড় মেয়ে হেলেনার সংসারেই থাকতেন। বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর ২০০৭ সালে মিনু রহমান মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর জন্ম মৃত্যুর কোনও তারিখ জানা যায় না। শিল্পী সমিতি কিম্বা বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভও এ ব্যাপারে ভুমিকা পালন করতে যথেষ্ট ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
এমনি করেই বুঝি অনাদরে অবহেলায় তিলে তিলে ঝরে নিঃশেষ হয়ে যায় একজন শিল্পী। আর অপমৃত্যু ঘটে শিল্পের।
মিনু রহমান, খুব মনে পড়ে আপনাকে। মনে পড়ে '৭২ সালে পরিচালক সিবি জামানের 'ঝড়ের পাখি' ছায়াছবিতে বিছানায় শায়িত এক প্যারালাইজড ব্যাংক কর্মকর্তার অনাহার ও দারিদ্রক্লিষ্টে জর্জড়িত স্ত্রীর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করা এক 'ভাবি' চরিত্রের কথা।
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি অযত্নে অবহেলায় ঝরে যাওয়া এক পত্রপল্লব মিনু রহমানকে। শ্রদ্ধাঞ্জলি।
 


এ জাতীয় আরো খবর