সেদিন ছিলো বসন্ত পূর্ণিমা।
সকাল থেকেই প্রভাত ফেরি আরম্ভ হয়েছে, আমিও ছিলাম প্রভাত ফেরিতে।
তুমি তখন কলকাতায় প্রেসিডেন্সি তে পড়তে গেছো, উঠতি কবি তুমি।
পাজামা পাঞ্জাবি পরে সাধরণ কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে তুমি হনহন করে হেঁটে আসতে, চোখ দুটো ছিল গভীর, কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে ঢাকা।
তুমিও থাকতে প্রভাতফেরিতে, তোমার চোখদুটো আমাকে খুঁজে বেড়াতো। দৌড়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে পড়তে।
" ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল লাগলো যে দোল' গাইতে গাইতে আমরা গৌড় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতাম। মাঝে মাঝে তুমি সবার অলক্ষ্যে আমার হাতটা চেপে ধরে আদরের চাপ দিতে। আমি চোখ তুুলে হাসলেই তুমি বলতে, তোর চোখে পলাশ ফোটে, আমি ঠাট্টা করে বলতাম, বেশি পলাশ ফুটিয়োনা, সামনে কিন্তু চৈত্র মাস,তুমি গম্ভীর হতে চেষ্টা করেও হেসে বলতে, আমি জানিতো, ওই চোখেই লেখা আছে আমার সর্বনাশ '।
কিন্ত অম্লান দা তুমি একটু ভুল বলেছিলে সর্বনাশ আমার চোখে নয় তোমার চোখেই লেখা ছিলো, আমিই বুঝতে পারিনি। সেদিন বসন্ত উতসব শেষ হয়ে যাবার পর আমরা দুজন কোপাইয়ের ধারে চলে গিয়েছিলাম, তুমি আমাকে কাছে টেনে এনে মনের সুখে আবির মাখিয়ে ছিলে, তোমার আদরে সেদিন আমি ভেসে গিয়েছিলাম, আসন্ন সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদ যখন উঠলো তখন তুমি আর আমি বনজোছনার আড়ালে, দুজনে প্রাণে মনে জোছনা ধারায় সিক্ত হয়েছিলাম।
প্রথম প্রথম সপ্তাহে একবার আসতে, তারপরে দুবার তারপর একদিন বললে মাসে একবারের বেশি আর তোমার কাছে আসতে পারবোনা নয়ন, তুমি রাগ করবেনা তো?
মুখ তুলে জানতে চাইলাম কেনো?
তুমি আমার গালের ওপর পরে থাকা চুলগুলো সরাতে সরাতে বললে, আসলে টিউশনির পয়সা তো, কুলোতে পারছি না গো, আমি সাথে সাথেই বলেছিলাম, না না তুমি একদম কষ্ট পেয়োনা, আমি তো মনে প্রাণে জড়িয়ে আছি। বড্ড বোকা ছিলাম আমি, এখন সে সব কথা ভাবলেও হাসি পায়। কমতে কমতে আসা একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। আর আমি অপেক্ষায় দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাড়ির থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এলো, ফিরিয়ে দিলাম। মায়ের সাথে প্রচুর ঝগড়া হলো। একদিন শুনলাম তুমি বিদেশে চলে গিয়েছো তোমারই এক ছাত্রী কে বিয়ে করে।
নিজের ওপর নিজেরই ভিষণ রাগ হচ্ছে, আমি কেনো ভুলতে পারছিনা! শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ আমি, আমিই আবার ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়লাম। আমাদের বিশ্বভারতীর অধ্যাপক, আমিও বিশ্বভারতী কলেজে পড়াই আর প্রবুদ্ধ পড়াতো ইকনমিক্স ডিপার্টমেন্ট এম এ ক্লাসে পড়াতো, ওর আণ্ডারে অনেক রিসার্চ স্টুডেন্ট ছিলো। স্বপ্নমাখা চোখ দুটিতে অনেক স্বপ্ন আঁকা ছিলো। তারপর একদিন এই দোলপূর্ণিমায় আমরা বিবাহবন্ধনে বাঁধা পড়ি। না এবার আর ঠকিনি, বেদনার রং যা গায়ে মেখে এতোদিন পুড়ে মরেছি, প্রবুদ্ধ আমার সব বেদনা মুছিয়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছে। নিষ্পাপ আর নির্মল ওর ভালোবাসা। আমাদের সন্তান আসে ফাল্গুন মাসে, আমি নাম দিলাম অপরাজিতা।
আমাদের দুজনের ভালোবাসার সেতু এই অপরাজিতা। প্রবুদ্ধ তার প্রসস্থ বুকে আমাদের আগলে রাখে, এখন খুব ভালো আছি।
সেই দোলেই তোমার সাথে আবার দেখা হলো, মনটা বিশিয়ে গেলো, দেখলাম তুমি একা এসেছ, তুমি এগিয়ে আসছিলে আমাকে দেখে, আমি যেতে শুধু বললাম আমি বিয়ে করেছি, আমি খুব ভালো আছি এখন, এই আমার মেয়ে, নাম অপরাজিতা, নামটা আমার দেওয়া, যত যন্ত্রণা, বেদনাই জীবনে আসুক না কেনো, সবসময় যেন সব ব্যাথা বেদনাকে জয় করে অপরাজেয় থাকে, হেরে না যায়, ওর মা যেমন জিতে গিয়ে জয় করেছে মিথ্যে দুঃখকে ও তেমনি থাকবে অপরাজিতা।
তুমি আর একটি কথাও না বলে ধীরে ধীরে ভিড়ের মাঝে মিশে গেলে। আমি চললাম অপুকে নিয়ে আমার বাড়িতে।