শুক্রবার, মে ১, ২০২৬

কো হি নু র র হ মা ন

  • টেপি
  • ২০২৩-১১-২২ ১০:২২:৩০

আয়েন আপা আয়েন? এইহানে বয়েন।আমাকে দেখে বসতে বলছে শেফালি। সরু লম্বাকৃতির একটা চৌকি।কভার ছাড়া চিটচিটে বালিশে আধ শুয়া রবি। তার দু'চোখই অন্ধ। যদিও লম্বা চওড়া। চমৎকার দেহের গঠন। পায়ের কাছে শেফালি। যতোদূর সম্ভব সেজে গুজে স্বামী দেবতার পা টিপছে। বৌ এর ব্যস্ততা দেখে রবি বেড়ার সাথে মিশে জায়গা করে দিলো।তখনো দু'জনের মুখে হাসি লেগে আছে।যেন কতো আহ্লাদ। খুব সম্ভব তারা খোশগল্পে মত্ত ছিলো। 
আমি বল্লাম, 
বসবো না। এই কয়টা জিনিস রাখো। কিছু চাল,ডাল,তেল,আটা সাথে ছিলো। মনে মনে ভাবছি প্রতি মাসে এই দম্পতিকে কিছু দান করবো।
সরকারী জায়গা। ড্রেন ঘেষা। নড়বড়ে ছোট্ট চালা ঘর। ফাঁকা পাটখড়ির বেড়া। দু'চারটা  হাঁড়ি পাতিল। দড়িতে ঝুলছে নিত্য ব্যবহার্য্য শাড়ি লুঙ্গি । এক কোণে এক টুকরা কাঠ বেঁধে রাখা হয়েছে সাবান। সাথে প্লাস্টিকের বক্সে সিঁদুর কৌটা, টিপের পাতা, লিপিস্টিক, কাজল, ফিতা। বেড়ায় গেঁথে রাখা একটা  আয়না ও চিরুনি।  এই সব নিয়ে তাদের সাজানো ছোট্ট সংসার।রবি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী আপ ডাউন ট্রেনে উঠে চকলেট বিক্রি করে। তা থেকে যা আয় হয় এক আধ পেটা খেয়ে চলে। অভাব নিত্য সঙ্গী। তবুও এই যুগল দেখে বুঝা যায় কিছু না থাকলেও সুখের অভাব নেই। কথায় বলে না টাকা হলেই সুখ হয় না।
সুখ আপেক্ষিক।  সাত তলায় থাকে না।  গাছ তলায়ও থাকে। 
প্রাতঃভ্রমণের সময় প্রায়শঃই শেফালির সাথে দেখা হয়। কথা হয়। সে রাস্তার কলে এসে হাড়ি পাতিল মাঝে। রবিকে পিঁড়িতে বসিয়ে ইচ্ছেমতো সাবান মেখে স্নান করায়। রবি জলের ছিটা মুখে দিয়ে দাঁত বের করে পিটপিটিয়ে হাসে। শেফালি নিজেও স্নান সারে। সাথে জল নিয়ে চালায় যায়। তার যতটুকু আছে তা দিয়েই সাধ্যমতো নিজেকে গুছিয়ে রাখে।
সত্যি বলতে শেফালির মতো কুৎসিত চেহারার মেয়ে মানুষ আমি আমার এ বয়স অবধি দেখিনি। উচ্চতা খুব বেশী হলে দুই হাত। কুচকুচে কালো। মোটা ঠোঁট। চেপ্টা নাক। ফোলা গাল।হলুদ চোখ। হাত, পা বামুনদের যা হয় আর কি! এক কথায় জটিল বিশ্রি। তবে বাচনভঙ্গি দারুণ মিষ্টি। বিধাতা না-কি মানুষকে একেবারে ঠকায় না। তাছাড়া শেফালির একটা সুন্দর মন আছে।সেই মনে প্রেম আছে। তাইতো সে রবিকে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছে।  রবি দৃষ্টিহীন । শেফালির উপরের রূপ সে দেখে না। শুনেছি অন্ধদের অন্তর দৃষ্টি প্রখর। হয়তো তাও এখন বৌ এর প্রেম ভালোবাসায় অন্ধ। মেয়েটাও তার  অন্ধ স্বামীকে নিয়ে বেমালুম সুখে আছে। দেখেই বুঝা যায় তার ভেতর বাহিরে কেমন একটা রঙের ঢেউ খেলে।
পরমের অপার মহিমা বুঝা বড়ো দায়। অন্ধ আর কুৎসিত দিয়ে কি চমৎকার জুটি বেঁধেছে। 
আজ থেকে বৎসর খানেক আগে শরতের কাক ডাকা ভোরে হিন্দু পল্লীর শিউলি তলায় প্রথম শেফালিকে দেখে আমি পেত্নী ভেবে ভয় পেয়েছিলাম। তার আজলা ভর্তি ছিলো শিউলি ফুল।
কিন্তু না এইভাবে পরপর বেশ কয়েক দিন দেখি। শিউলি কুড়াতে। তারপর একদিন বলি,
এই ফুল দিয়ে তুমি কি করো? 
হেসে হেসে মেয়েটি বলছে,
মালা গাঁথি গো মালা! তারপর দেবতার গলে পরাই। পায়ে পূ্ঁজো দেই।
আমি অবাক হই। আর যাই হোক। ও ধার্মিক। কি চমৎকার মিষ্টি কথা।মেয়েটির চেহারা পেত্নী হলেও ওর কথার প্রেমে পড়া-ই  যায়।
তার পরদিন বলি,
এই মেয়ে তোমার নাম কি গো...?
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলে,
শেফালি।
এই তো মাস পাঁচেক আগে হঠাৎ দেখি শেফালির লম্বা সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। লাল গুড়ো এসে নাকে ঠেকেছে। লাল ফিতার বেণী দুলছে পিঠে। কপালে বড় লাল টিপ। ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক। হাতে শাঁখা পলা।গুছিয়ে শাড়ি পরা। আমি তো অস্থীর!  এই মেয়ে মানুষ বিয়ে করলো কে...?  তবে হিন্দু মেয়েরা যতো কুৎসিতই হোক সিঁদুরে একটা আলাদা চমক লাগে। বিশেষ করে কুচকুচে কালো মেয়ের সিঁথি লেপ্টানো লাল টকটকে সিঁদুর। এ যেন এক ভিন্ন মাত্রা।
বেশ কিছুদিন শেফালিকে দেখি না। চিন্তা করলাম,  আগামীকাল কিছু চাল ডাল নিয়ে ওর চালায় যাবো।
রাস্তার যে কলে শেফালি আসে সেখানে ২/৪ জন মহিলা কথা বলছে,
কি করুণ মৃত্যু হলো ছেলেটার। আমি আগ বাড়িয়ে বলছি,
কার মৃত্যু হলো...? 
তাদের একজন বলছে, 
ক্যান...!  জানেন না রবি গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়েছে। আজ সাত দিন। লাশের খবর পেয়েছে টেপি তিন দিন পর।
টেপি কে?
রবির বৌ। তবে রবি ভালোবেসে ওকে শেফালি ডাকতো। কি গভীর প্রেম ছিলো ওদের। ছেলেটার আন্ধা চোখে এই কুৎসিত টেপি ছিলো শরতের শেফালির মতো সুন্দর।
আর টেপিই কম যায় কিসে...? দৃষ্টি হীন ছেলেটাকে প্রতিদিন দেবতা জ্ঞানে পূঁজো দিতো। মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতো।
আমি স্তব্ধ। পা চলছে না। আস্তে আস্তে চালার সামনে যাই।
অর্ধেক ঝাপি খোলা। বিমর্ষ শেফালি পা ছড়িয়ে, চুল এলিয়ে, মাটিতে বসে অপলক নেত্রে বাহিরে তাকিয়ে আছে। রবির তাপে পোড়া রঙহীন ম্লান শেফালিকে দেখে ভেতরটা হু হু করে উঠলো।

 


এ জাতীয় আরো খবর