শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ, রাষ্ট্রীয় ও দলীয় নানা কর্মসূচি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক |
  • ২০২৬-১১-০৭ ০৯:৩০:২৯
ফাইল ছবি

 সকালের আলো ডট কম
আজ ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের ৫১ বছর পূর্তি উপলক্ষে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দিনটি উপলক্ষে সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর দেশে সাধারণ ছুটি পালিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। একই নির্দেশনা কার্যকর রয়েছে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দিনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকায় ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হবে। সাধারণ ছুটির আওতায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশের সব তফসিলি ব্যাংক বন্ধ রয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। অন্যদিকে,ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আজ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার জন্য সব যানবাহনের চলাচলে টোলমুক্ত রাখা হয়েছে।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। আজকের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ১১টায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন। এরপর বেলা ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের হওয়ার কথা রয়েছে। র‍্যালিটি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করবে। একই দিনে দেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়েও বিএনপির উদ্যোগে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল ৮ নভেম্বর থানা ও উপজেলা পর্যায়ে র‍্যালির আয়োজন করা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন,দিবসটি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। র‍্যালি সফল করতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনগুলো প্রস্তুতি নিয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে একটি গণতান্ত্রিক,ন্যায়ভিত্তিক,মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দুর্নীতি, বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতীয় স্বার্থ, সাম্য, ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রচর্চাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্য ও দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর মতে,ওই দিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত হয়েছিল এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নতুন মাত্রা পেয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অতীতের ঘটনাবলি নিয়ে অনবরত পড়ে থাকা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ইতিহাসকে উপেক্ষা করে সামনের পথ তৈরি করাও ভুল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভবিষ্যতে যেন কেউ জনগণের অধিকার হরণ করতে কিংবা বাংলাদেশকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের দিবসের অন্যতম অঙ্গীকার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হচ্ছে। জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় মসজিদে মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুসদন, কিশোর সংশোধনাগার ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিশুদের জন্য দেশের বিভিন্ন শিশু পার্ক দিনব্যাপী বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন,বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। সিনেমা হল ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থায় প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে স্মারক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের তত্ত্বাবধানে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত বিপ্লব দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর মতে, ৩ থেকে ৫ নভেম্বরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের বক্তব্যও সে সময় জনগণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট মারুফ কামাল খান ৭ নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, সাংবাদিক ও কলামিস্ট গাজীউল হাসান খান মনে করেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল।
ইতিহাসের নানা ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বর আজও বাংলাদেশের জাতীয় আলোচনায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দিবসটি পালনের পাশাপাশি অতীতের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, ৭ নভেম্বর ২০২৬, তারেক রহমান

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস),বিএনপির আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি,দ্য ডেইলি স্টার।


এ জাতীয় আরো খবর