রাষ্ট্রের উন্নয়নে জমি দিয়ে ক্ষতিপূরণ পেতে মাসের পর মাস ভোগান্তিতে জমির মালিকরা, প্রশাসনিক সেবা বিকেন্দ্রীকরণের দাবি!
মহেশখালী (কক্সবাজার)
একদিকে রাষ্ট্রের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিগ্রহণ করা হচ্ছে মহেশখালীর মানুষের বাপ-দাদার ভিটেমাটি, কৃষিজমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি; অন্যদিকে সেই জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে তাঁদেরই ছুটতে হচ্ছে কক্সবাজার জেলা শহরে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে মহেশখালীর মানুষ জমি দিতে কার্পণ্য করছেন না, অথচ নিজেদের জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে কেন তাঁদের মাসের পর মাস জেলা শহরে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় জনমনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর,বিদ্যুৎকেন্দ্র,অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ একাধিক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মহেশখালী এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কেন্দ্র। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন হাজারো স্থানীয় জমির মালিক। কিন্তু অধিগ্রহণ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় বারবারযাতায়াতের অভিযোগ তাঁদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে মহেশখালীর জমি অধিগ্রহণ করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেই মহেশখালীতে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত সেবা প্রদানের জন্য একটি স্থানীয় কার্যালয় বা স্থায়ী সেবা কেন্দ্র থাকবে না কেন?
মহেশখালীতে এলএ অফিস স্থাপন করা হোক।
প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থার যুগে ক্ষতিপূরণের আবেদন, নথি যাচাই, শুনানি ও অর্থ প্রদানের জন্য জমির মালিকদের বারবার জেলা শহরে যেতে হওয়া কতটা যৌক্তিক?
মেগা প্রকল্পের জন্য জমি, কিন্তু সেবা নিতে জেলা শহরেঃ- মহেশখালীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এখানে একাধিক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধি গ্রহণের ফলে বহুপরিবার তাদের দীর্ঘদিনের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছেন। জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার জন্য জমির মালিকদের নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, মালিকানা যাচাই, শুনানি, নথির ত্রুটি সংশোধন কিংবা ক্ষতিপূরণের ফাইলের অগ্রগতি জানতে তাঁদের কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।স্থানীয়ভাবে সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দূরবর্তী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। প্রতিবার যাতায়াতে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। অনেকের পক্ষে বারবার জেলাশহরে যাওয়া আর্থিক ও শারীরিক ভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, বাড়ছে জনদুর্ভোগ জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণ পাওয়া জমির মালিকদের আইনগত অধিকার। কিন্তু বাস্তবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের ঘাটতি, মালিকানা ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত জটিলতা, নথি যাচাই এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার জমি হারিয়ে নতুন করে বসতি গড়তে চান কিংবা ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে চান, তাঁদের জন্য সময়মতো অর্থ পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়, মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। তাই ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত,স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা জরুরি।
মহেশখালীতে এলএ অফিস প্রতিষ্ঠা কি প্রশাসনিক ভাবে সম্ভব নয়? কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের অধীনে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কার্যক্রম পরিচালিত হলেও মহেশখালীতে স্থানীয় সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জোরদাবী মহেশখালী বাসীর। উপজেলা সদরে জেলা প্রশাসনের অধীনে একটি এলএ ক্যাম্প অফিস বা স্থায়ী সেবা কেন্দ্র চালু করা হলে জমির মালিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গ্রহণ, নথি যাচাই, শুনানি, ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। এ জন্য নতুন করে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে জেলা প্রশাসকের এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মহেশখালীতে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।ন একই সঙ্গে যথাযথ অনুমোদন,
ব্যাংকিং নিরাপত্তা ও আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করে স্থানীয়ভাবে ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আইনে ক্ষতিপূরণ প্রদানের সময়সীমা রয়েছে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন,২০১৭ অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।আইনের ৯ ধারায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় জমির বাজারমূল্যসহ বিভিন্ন আর্থিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনার বিধান রয়েছে। সরকারি প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ২০০ শতাংশ ক্ষতি পূরণের বিধানও রয়েছে।আইনের ১১ধারায় রোয়েদাদ প্রস্তুত এবং প্রত্যাশী ব্যক্তি বা সংস্থার অর্থ জমা দেওয়ার পর আইনগত শর্ত সাপেক্ষে অনধিক ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান রয়েছে।
তবে মালিকানা বিরোধ, উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রতিবন্ধকতা থাকলে অর্থ প্রদানে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে প্রতিটি ক্ষতিপূরণ মামলার বর্তমান অবস্থা, বিলম্বের কারণ এবং দায়ী প্রশাসনিক পর্যায় চিহ্নিত করা জরুরি।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি,বর্তমান সময়ে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।অথচ মহেশখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ-
সংক্রান্ত সেবার জন্য স্থানীয় কার্যালয় না থাকা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি স্থানীয় এলএ সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু জমির মালিকদের ভোগান্তিই কমবে না; বরং প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়বে, নথি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং জমির মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কেন বিলম্ব হচ্ছে এবং কখন অর্থ পাওয়া যেতে পারে এসব তথ্য জানার জন্য একটি নির্দিষ্ট তথ্যসেবা ডেস্ক চালু করাও জরুরি।
কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ও জেলা প্রশাসন কাছে জনস্বার্থের দাবিঃ-
মহেশখালীতে এলএ অফিস বা স্থায়ী সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক,অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব),জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।বিশেষ করে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্যের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মহেশখালীর অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ, ক্ষতিগ্রস্ত মালিকের সংখ্যা, ক্ষতিপূরণ প্রদানের অগ্রগতি এবং অপেক্ষমাণ ফাইলের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
উন্নয়নের স্বার্থে ত্যাগ, নাগরিক সেবায় অবহেলা নয়,
মহেশখালী শুধু একটি দ্বীপ উপজেলা নয়;এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রবন্দর ও শিল্পায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণে স্থানীয় মানুষের জমি ও সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।যাঁরা রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের জমি ছেড়ে দিচ্ছেন, তাঁদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং সেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরই অংশ। উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল যেমন জাতীয় অর্থনীতিতে পৌঁছাবে, তেমনি উন্নয়নের জন্য ভূমি হারানো মানুষদের অধিকার ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের ক্ষতিপূরণ পেতে অযথা হয়রানি, সময়ক্ষেপণ ও বাড়তি যাতায়াতের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মহেশখালীর মানুষের প্রশ্ন একটাই দেশের উন্নয়নের জন্য জমি দিতে পারলে,সেই জমির ক্ষতিপূরণ গ্রহণের ব্যবস্থা মহেশখালীতে করা যাবে না কেন? এখন সময় এসেছে জেলা শহরকেন্দ্রিক সেবার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সেবা সম্প্রসারণের। মহেশখালীতে একটি এলএ অফিস অথবা স্থায়ী ক্ষতিপূরণ সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি নয়, এটি উন্নয়নকে জনবান্ধব করার একটি যৌক্তিক প্রশাসনিক উদ্যোগ। উন্নয়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ হোক, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভোগান্তি নয় মহেশখালীতে এলএ অফিস প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের জোরালো দাবি।