মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

ব্রাজিলে লুলার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-১০-২৭ ০৯:০৭:০১
ছবি: সংগৃহীত।

নাটকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও জয় পেয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। রোববার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। লুলার এই জয়কে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো এখনো নির্বাচনের ফল মেনে নেননি। 
চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৬ হাজার ২৩২ ভোট, যা মোট বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ ২৬ হাজার ৪১ ভোট বা ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ। দুই প্রার্থীর ব্যবধান ৪৪ লাখের বেশি ভোট। 
ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকা লুলা দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে নতুন মেয়াদ শুরু করবেন। 
লুলার বিজয়ের পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিনন্দন বার্তা আসতে থাকে। বাম ও ডান-দুই ধারার রাজনৈতিক নেতারাই ব্রাজিলের নির্বাচনী ফলকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন লুলার বিজয়কে গণতন্ত্র ও বহুপক্ষীয়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্রাজিলের সঙ্গে ইউরোপের অংশীদারত্ব আরও সমৃদ্ধ হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম লুলার বিজয়কে ব্রাজিলের জনগণের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানান এবং লুলাকে অভিনন্দন জানান।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেলও লুলাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি এই ফলকে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতার কথা বলেন। 
উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি জানান, তিনি লুলার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি লুলাকে বিজয়ের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান। 
আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্তিনা কির্শনারও লুলার বিজয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বর্তমানে দুর্নীতি মামলায় গৃহবন্দি কির্শনার লুলার রাজনৈতিক প্রচারণার সক্ষমতার প্রশংসা করেন।
লুলার জয় লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রবণতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে রক্ষণশীল ও ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান দেখা গেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের মতো লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ আবারও লুলার নেতৃত্বে বামঘেঁষা রাজনৈতিক ধারাকে বেছে নেওয়ায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে লুলার বিজয়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফ্লাভিও বলসোনারো নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তার পক্ষ থেকে ফল নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। তবে ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট লুলার বিজয় নিশ্চিত করেছে। 
পেরুর রক্ষণশীল নেত্রী কেইকো ফুজিমোরিও লুলাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি ব্রাজিল-পেরু কৌশলগত অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অভিন্ন আমাজন অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। 
চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তও লুলার বিজয়ের পর ব্রাজিলের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কথা বলেছেন। একইভাবে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া লুলার নতুন মেয়াদে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউরোপ থেকেও লুলার প্রতি সমর্থন এসেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ব্রাজিলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও লুলার বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে এটিকে প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 
এশিয়া থেকেও এসেছে অভিনন্দন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লুলাকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারত-ব্রাজিলের বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। ব্রাজিল ও ভারত উভয়ই ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও লুলার নতুন মেয়াদ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
রাশিয়াও লুলার বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রিকসের কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে লুলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চীনও নতুন মেয়াদে ব্রাজিলের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও লুলার বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের শ্রমজীবী মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে লুলার অবস্থানের প্রশংসা করেন।
সব মিলিয়ে লুলার পুনর্নির্বাচন শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; এটি লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ভারসাম্য, ব্রিকসের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, চীন-ভারত-ব্রাজিল সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রায় অর্ধেক ভোটার ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে থাকায় দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে নতুন মেয়াদে লুলার সামনে অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সমঝোতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ থাকবে।
  
ব্রাজিলে লুলার জয়, Lula reelected Brazil, ফ্লাভিও বলসোনারো


এ জাতীয় আরো খবর