মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬

নির্ভুল জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনেই শক্তিশালী হবে সুশাসনের ভিত্তি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-১০-০৬ ১১:০৭:৫২

আজ জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস। নাগরিকদের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণে নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য-'নির্ভুল নিবন্ধন,নিশ্চিত হবে সুশাসন'।
জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে একটি শিশুর অস্তিত্ব, পরিচয় ও জন্মসংক্রান্ত তথ্য রাষ্ট্রীয় নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়। একইভাবে মৃত্যুর পর মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে একজন নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্যক্তি ও পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনার জন্যও এ দুই ধরনের নিবন্ধনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
বর্তমানে নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েই জন্ম নিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি, চাকরি, বিয়ে নিবন্ধন, ব্যাংকিং কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য ব্যবহৃত হয়। ফলে শিশুর জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।
নিবন্ধনের সময় শিশুর নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, বাবা-মায়ের নামসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ভুল বা অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য ভবিষ্যতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন নথিতে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এর ফলে নাগরিককে প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি সময় ও অর্থের অপচয়েরও মুখোমুখি হতে হয়। তাই নিবন্ধনের আগে তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও একইভাবে যথাযথতা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত না হলে তার সম্পদ, উত্তরাধিকার, পারিবারিক অধিকার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরবর্তী সময়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সঠিকভাবে মৃত্যু নিবন্ধন সম্পন্ন হলে মৃত ব্যক্তির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদের পাশাপাশি উত্তরাধিকারী ও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক কাজও সহজ হয়।
একটি দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার চিত্র নির্ধারণেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সরকার জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যার পরিবর্তন ও মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়াও এর মাধ্যমে সহজ হয়।
জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনাতেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো এলাকায় জন্মহার, মৃত্যুহার, শিশুমৃত্যু কিংবা নির্দিষ্ট বয়সে মৃত্যুর প্রবণতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণ আরও কার্যকর করা সম্ভব। একই সঙ্গে রোগের প্রকোপ, মৃত্যুর কারণ এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বিশ্লেষণেও এসব তথ্য সহায়ক হতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থায়ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হয়েছে। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে তথ্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধন কার্যক্রমের মান উন্নয়ন জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু একটি দিবস পালন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে নিবন্ধন এবং মৃত্যুর পর যথাযথভাবে মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধন কার্যক্রমে হয়রানি, অনিয়ম, ভুল তথ্য ও দীর্ঘসূত্রতা বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা, নাগরিক জীবনে এর ব্যবহার এবং সঠিক তথ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
এবারের প্রতিপাদ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঙ্গে সুশাসনের সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকলে সরকারি সেবা প্রদান, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক করা সম্ভব।
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবসের মূল লক্ষ্য তাই কেবল নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়ানো নয়; জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভুল তথ্যকে রাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য নিবন্ধিত হলে নাগরিক অধিকার যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।

জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, সুশাসন


এ জাতীয় আরো খবর