সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬

মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা করতে শিক্ষকতায় সংস্কার: প্রধানমন্ত্রী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-১০-০৫ ১৯:০১:৪৮
ছবি: সংগৃহীত।

শিক্ষকতাকে কোনোভাবেই বিকল্প পেশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য তরুণরা যেন শিক্ষকতাকে কর্মজীবনের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেন, সে লক্ষ্যেই শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সোমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিক্ষক সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শিক্ষক সমাজের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়। তাই শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে নিয়োগব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে।
তিনি দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিতদের অভিনন্দন জানান।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষককে শুধু জ্ঞানদাতা নয়, প্রয়োজনীয় ও আপনজন হয়ে উঠতে হবে। পারিবারিক শিক্ষার পর শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হয়ে ওঠেন। সে কারণে শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সময়ে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। শিক্ষাদান ও শেখার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি পাঠ্যসূচিও আধুনিক করা প্রয়োজন। বাস্তবতার আলোকে নতুন পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন পাঠ্যসূচির বই হাতে পাবে।
শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন ও কীভাবে—এই প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল সৃষ্টি করা গেলে সে নিজেই জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আনন্দময় শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, এবার প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের মাধ্যমে শেখার উপযোগী নতুন বই দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা হবে।
প্রযুক্তির অগ্রগতিকে শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষকের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যেই একজন শিক্ষককে একটি করে ট্যাব দেওয়ার কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে পাঠ পরিকল্পনা, প্রশ্নভাণ্ডার, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও বিনা মূল্যে তারহীন ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, কোনো শিশু যেন শিক্ষার বাইরে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কেউ শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে ঝরে পড়লেও যাতে কর্মহীন হয়ে না পড়ে, সেজন্য শিক্ষাকে জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষা খাতকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের পার্থক্য দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। দেশের সব এলাকার শিক্ষার্থীরা যাতে দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, সে লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কর্মমুখী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনও শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যের অংশ।
সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পরিবারের পর শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য কাজ করা হচ্ছে বলে জানান।
জাতীয় দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে এসব অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পেতে যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান তিনি। যথাসময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে দেশের শিক্ষকরা অন্যতম প্রধান শক্তি। তাই কর্মরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত-পেশার কারণেই একজন শিক্ষক রাষ্ট্রের কাছে আজীবন সম্মানের দাবিদার।
এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো, পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ। শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস, শিক্ষকতা পেশা, শিক্ষা সংস্কার


এ জাতীয় আরো খবর