বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

বিদায়ী ভাষণে গুতেরেস: যুদ্ধ, গাজা ও এআই নিয়ে বিশ্বব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-০৯-২৩ ১০:৪০:৩৬
ছবি: সংগৃহীত।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর বিদায়ী ভাষণে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও মানবিক সংকট, গাজায় প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘের কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে গুতেরেস এসব কথা বলেন। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং ক্ষমতার অসম বণ্টনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে গুতেরেস বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় যে মাত্রায় প্রাণহানি ও ধ্বংস হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন মাত্রার ধ্বংস আর দেখেননি। গাজায় জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা, কর্মী ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাব শুধু সম্মুখযুদ্ধের এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; বেসামরিক মানুষও প্রাণ হারাচ্ছেন এবং অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রভাব খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গুতেরেস তিনটি বড় প্রবণতার কথা বলেন। প্রথমত,বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত,ক্ষমতা ক্রমেই কিছু বড় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তৃতীয়ত, মানুষের কাছ থেকে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের দিকে ক্ষমতা স্থানান্তরিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশকে তিনি এ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে গুতেরেস বলেন, প্রযুক্তি নিজে বিপদ নয়; জবাবদিহি, তদারকি ও স্বচ্ছতা ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহারই বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এআই ব্যবস্থাপনায় বহুপক্ষীয় কাঠামো, স্বাধীন তদারকি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কখনোই যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলেন গুতেরেস। একুশ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তোলা প্রয়োজন।
শান্তি সম্পর্কে গুতেরেস বলেন, শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; আইনের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করাও শান্তির অংশ। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। তাঁর ভাষণে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, উন্নয়ন ও শান্তিকে পরস্পরসম্পর্কিত বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়।
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ ভূমিকা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধ, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার বাইরে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারই হবে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি।
দশ বছরের মহাসচিবের দায়িত্ব শেষে দেওয়া এই ভাষণে গুতেরেসের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট-শক্তি দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। শান্তির জন্য প্রয়োজন আইন, সংযম, সহযোগিতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ। পরিবর্তিত বিশ্বে জাতিসংঘকে সেই মূল্যবোধের ভিত্তিতেই আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

গুতেরেস, জাতিসংঘ, বিশ্বসংকট


এ জাতীয় আরো খবর