রবিবার, জুলাই ১৯, ২০২৬

জলঢাকায় সরকারি বরাদ্দে হরিলুট কারবার : অস্তিত্বহীন প্রকল্পে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

  • জলঢাকা (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ
  • ২০২৬-০৭-১৮ ১৭:৪৬:০০

জলঢাকা (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ নীলফামারীর জলঢাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে চলছে হরিলুট। কাগজে-কলমে রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের ফিরিস্তি থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের যোগসাজশে একই রাস্তায় একাধিকবার বরাদ্দ গ্রহণ ও ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়মের প্রতিবাদে এলাকাবাসী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৈমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের বড়ঘাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্রিজ থেকে দুর্গা মন্দির পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও এইচবিবি করণের জন্য ৫ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, একই রাস্তা সংস্কারের নামে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো কাজের অস্তিত্ব নেই। পথচারী সামছুল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের রাস্তায় বারবার বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্থানীয় বাসিন্দা উপিল ও বিজেন চন্দ্র রায় সহ আরো অনেকেই জানান, কিশোরগঞ্জের ‘মেসার্স সালাম ট্রেডার্স’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত সীমানা পর্যন্ত এই রাস্তাটির কাজ করার পর অবশিষ্ট কিছু অংশ স্থানীয় মেম্বারসহ আমরা এলাকাবাসী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে করে নিয়েছি। অথচ দুইবার সরকারি বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে প্রকল্প কমিটির নামে সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পস্থলে কাজের বিবরণ সংবলিত সাইনবোর্ড থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এখানে তার কোনো বালাই নেই।
প্রকল্পের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য তবিবুল ইসলামের কাছে কমিটির সদস্যদের নাম জানতে চাইলে তিনি বিস্ময়করভাবে জানান, তার কাছে কোনো তথ্য নেই। এমন দায়সারা উত্তর প্রকল্পটির স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া গোলনা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে লুৎফরের বাড়ি থেকে হাকিনুরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার কাজেও নয়ছয় করার ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নামমাত্র ইট ব্যবহার করায় তা কয়েকদিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নাহিদুজ্জামান তার কার্যালয়ে রীতিমতো ‘স্ট্যাম্প বাণিজ্য’ গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে স্ট্যাম্প খরচের নামে প্রকল্প কমিটির কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে দুই হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি প্রকল্প কমিটিকে ডিও কপি না দিয়ে বহিরাগতদের হাতে ডিও কপি তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মাঠপর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাবে পিআইও অফিসের যোগসাজশে প্রকল্প সভাপতিরা অনিয়মের এই অবাধ সুযোগগুলো পাচ্ছে বলে সচেতন মহলে জানা গেছে। 
১৪ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জলঢাকা উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে টিআর ১০০টি, কাবিখা ৬৫টি, গম ও চালের ২৪টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর ৪৯টি, কাবিখা ৩৬টি ও গম-চালের ২২টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে এখন গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। এখানে অনিয়ম বা ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি প্রকল্পের কাজে যেকোনো অনিয়মের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ক্ষতিয়ে দেখে প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদুজ্জামানের কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সরকারি অর্থের এই বেপরোয়া নয়ছয় এবং পিআইও অফিসের অনিয়মের কারণে রাস্তা ও স্থাপনাগুলো টেকসই হচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকারি বরাদ্দের অপচয় রোধে এবং সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।


এ জাতীয় আরো খবর