শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

মৃত্যুকে সঙ্গী করেই জীবিকার সন্ধান,উত্তাল বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জীবন-মৃত্যুর লড়াই

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-১৮ ১৫:০৪:৩৩

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
উত্তাল বঙ্গোপসাগরে  প্রতিটি ঢেউ যেন মৃত্যুর আহ্বান, আকাশজুড়ে কালো মেঘ,দমকা বাতাস, ১০ থেকে ১৫ ফুট উঁচু ঢেউ আর অনিশ্চিত গন্তব্য এমন পরিস্থিতিতে যেখানে অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যেতে চান, সেখানে বাংলাদেশের  উপকূলের হাজারো জেলে জীবিকার তাগিদে ছুটে যান গভীর বঙ্গোপসাগরে। 
কারণ  তাদের  কাছে  সমুদ্র শুধু জলরাশি নয়;পরিবারের ভাতের থালা, সন্তানের পড়াশোনার 
খরচ,বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ এবং বেঁচে থাকারশেষ অবলম্বন।
জীবন  জীবিকার  তাগিদে  প্রতিদিন  শত শত ফিশিং ট্রলার  কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, চট্টগ্রাম,  পটুয়াখালী,   ভোলা,  বরগুনা   ও   অন্যান্য উপকূলীয় এলাকা  থেকে গভীর সাগরে পাড়ি জমায়। প্রতিটি  যাত্রাই  অনিশ্চয়তায়  ভরা।  কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো  নিম্নচাপ,  কখনো   ইঞ্জিন    বিকল,   কখনো দস্যুদের হামলা, আবার কখনো কয়েক দিন ধরে মাছ না  পাওয়ার  হতাশা  সবকিছুকে  সঙ্গী করেই তাদের সংগ্রাম।
জেলেরা বলছেন,"সাগরে যাওয়ার সময় আমরা জানি না   ফিরে   আসতে   পারব  কি  না।  কিন্তু  না  গেলে পরিবারের   চুলায়  আগুন  জ্বলবে  না।"  মৃত্যুর  সঙ্গে প্রতিদিনের সহাবস্থান, গভীর  সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের    সবচেয়ে    বড়   শত্রু   বৈরী আবহাওয়া। আবহাওয়া  দ্রুত বদলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শান্ত সমুদ্র রূপ নেয় ভয়ংকর রুদ্ররূপে। বিশাল ঢেউয়ে ছোট-বড়   ট্রলার  দুলতে  থাকে, অনেক  সময়  ট্রলার ডুবে  যায়,  জেলেরা   নিখোঁজ   হন  বা  প্রাণ   হারান।
শুধু  প্রাকৃতিক   দুর্যোগ   নয়, গভীর   সমুদ্রে  দস্যুদের উৎপাত,  জ্বালানির  সংকট, যান্ত্রিক  ত্রুটি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া  এবং পর্যাপ্ত উদ্ধারব্যবস্থার অভাবও তাদের  জন্য  বড়  ঝুঁকি, জীবনের চেয়ে বড় জীবিকা।
অধিকাংশ জেলে ঋণনিয়ে সমুদ্রে যান ট্রলারমালিকের অগ্রিম   টাকা, মহাজনের  সুদ  কিংবা  এনজিওর ঋণ শোধের  চাপ  তাদের বারবার সাগরে যেতে বাধ্য করে। অনেক সময়  বৈরী আবহাওয়ার  সতর্কবার্তা থাকলেও আর্থিক চাপে তারা যাত্রা বাতিল করতে পারেন না।
একজন প্রবীণ জেলের ভাষায়,"ঝড়কে ভয় পাই,কিন্তু ক্ষুধাকে আরও বেশি ভয় পাই। "সমুদ্রে একেকটি দিন
একটি মাছ ধরার অভিযানে  ট্রলারগুলো ৭ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে। সীমিত খাবার, বিশুদ্ধ পানির সংকট, সংকীর্ণ জায়গায় বসবাস এবং প্রায় সারাক্ষণ কাজ এটাই তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা ঘুমও হয় পালা করে।
জলবায়ু  পরিবর্তনের   নতুন   চ্যালেঞ্জ  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়,  অস্বাভাবিক    ঢেউ   এবং    আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের ঝুঁকি বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলেদের জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপর। একই  সঙ্গে  মাছের  বিচরণক্ষেত্র  পরিবর্তিত  হওয়ায় আগের   তুলনায়   আরও   গভীর  সমুদ্রে যেতে হচ্ছে।
হারিয়ে   যাওয়া  মানুষের   অপেক্ষা   প্রতি  বছর বৈরী আবহাওয়ায়   অনেক   ট্রলার   নিখোঁজ হয়।   অনেক জেলের   মরদেহও  আর  ফিরে  আসে না। উপকূলের অসংখ্য  পরিবার  বছরের  পর   বছর  অপেক্ষা  করে একদিন  হয়তো  তাদের  স্বজন ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয় না।
নিরাপত্তা  ব্যবস্থার  সীমাবদ্ধতা, জেলেদের অভিযোগ সব  ট্রলারে  আধুনিক  যোগাযোগযন্ত্র  নেই।   অনেক ট্রলারে পর্যাপ্ত  লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ র্যাফট থাকে না।দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান সব সময় সম্ভব হয়   না।   অধিকাংশ    জেলের     জীবনবীমা   নেই।
দুর্ঘটনায়   ক্ষতিগ্রস্ত    পরিবারগুলো  পর্যাপ্ত  আর্থিক সহায়তা পায় না।
অর্থনীতিতে জেলেদের অবদান,বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ  দেশের   খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান  এবং রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা রাখে। এই খাতের মূল চালিকাশক্তি   উপকূলের    জেলেরা।    অথচ  তাদের জীবনমান,  নিরাপত্তা   এবং   সামাজিক  সুরক্ষা নিয়ে এখনো বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে গভীর সমুদ্রে আধুনিক ট্র্যাকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। প্রতিটি ট্রলারে পর্যাপ্ত  নিরাপত্তা  সরঞ্জাম  নিশ্চিত করা। জেলেদের জন্য  জীবনবীমা  ও  দুর্ঘটনা  ক্ষতিপূরণ  চালু করা।
আবহাওয়ার   পূর্বাভাস  দ্রুত  ও  সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া। উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। স্বল্পসুদে ঋণ ও সামাজিক   নিরাপত্তা   কর্মসূচি   সম্প্রসারণ  করা।
পর্যটকের চোখে বঙ্গোপসাগর সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু একজন  জেলের  কাছে সেই বঙ্গোপসাগর প্রতিদিনের যুদ্ধক্ষেত্র।  প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে তিনি লড়েন শুধু মাছ ধরার জন্য নয়;পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের স্বপ্ন এবং নিজের  অস্তিত্ব  রক্ষার  জন্য। সাগরের প্রতিটি উত্তাল ঢেউ আজও সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশের জেলেরা কেবল শ্রমিক   নন,   তারা   দেশের  নীরব যোদ্ধা। অথচ এই যোদ্ধাদের    জীবন    এখনো    অনিশ্চয়তা,  ঝুঁকি ও অবহেলার মাঝেই বন্দী।

 


এ জাতীয় আরো খবর