আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই-
আয়না চুপ থাকে।
চুপ থাকাই তার পেশা,
সত্য বলা নয়।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি,
'আমি কেমন আছি?'
সে আমার হাসিটুকু ফেরত দেয়,
ভেতরের ফাটল নয়।
আমরা এখন খুব দক্ষ-
নিজেকে বোঝাতে।
সব ঠিক আছে।
সব চলবে।
সব সামলে নেবো।
অথচ রাতের বালিশ জানে
আমার শ্বাসের ভেতরে কত ভাঙা সিঁড়ি।
আমি বলি-
ব্যর্থতা ছিল পরিকল্পনার অংশ।
অসততা ছিল কৌশল।
নীরবতা ছিল পরিপক্বতা।
আসলে
আমি ভয় পেয়েছিলাম।
এই শহর আমাদের শিখিয়েছে-
সফলতার ছবি পোস্ট করো,
ক্ষতের নয়।
ফিল্টার দাও মুখে,
সত্যে নয়।
আমি নিজের জীবনের এডিটর হয়ে
কেটে ফেলেছি
সব অস্বস্তিকর দৃশ্য।
রেখেছি কেবল করতালির শব্দ।
তবু মাঝরাতে
ড্রাফটে পড়ে থাকা সত্যগুলো
নোটিফিকেশন হয়ে জ্বলে ওঠে।
আমি নিজেকে বলেছি-
ও আমাকে অবহেলা করেনি,
সে শুধু ব্যস্ত ছিল।
আমি তাকে হারাইনি,
সময়ই দূরে নিয়ে গেছে।
কিন্তু সত্যি হলো-
আমি প্রশ্ন করতে পারিনি।
কারণ উত্তর শুনতে ভয় ছিল।
আত্মপ্রতারণা খুব সূক্ষ্ম শিল্প-
এতে রক্তপাত নেই,
কিন্তু ধীরে ধীরে
অস্তিত্বের রঙ বদলে যায়।
তুমি নিজেকে বোঝাও-
তুমি সুখী।
কারণ দুঃখ স্বীকার করলে
লড়াই করতে হবে।
তুমি নিজেকে বোঝাও-
তুমি সৎ।
কারণ ভুল মেনে নিলে
ক্ষমা চাইতে হবে।
তুমি নিজেকে বোঝাও-
তুমি ভালোবাসো না আর।
কারণ ভালোবাসা মানে
আবার ভাঙার ঝুঁকি।
আমি দেখেছি-
মানুষ মিথ্যা বলে পৃথিবীকে কম,
নিজেকে বেশি।
আমরা নিজেরাই নিজের উকিল,
নিজের বিচারক,
নিজের সাক্ষী-
এবং অদ্ভুতভাবে
নিজেরই অভিযুক্ত।
একদিন হঠাৎ
সব অজুহাত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
সব যুক্তি ফুরিয়ে যায়।
ভেতরের শিশুটি দরজায় কড়া নাড়ে-
'তুমি কি সত্যিই ভালো আছো?'
সেদিন প্রথমবার
আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে বলি-
'না।'
এই ‘না’
আমার পরাজয় নয়।
এটাই আমার শুরু।
আত্মপ্রতারণা ভাঙা মানে
নিজেকে দোষী করা নয়,
নিজেকে উদ্ধার করা।
সত্য স্বীকারের মুহূর্তে
এক ধরনের নিঃশব্দ মুক্তি আছে-
যেন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঘরে
জানালা খুলে দেওয়া।
হাওয়া ঢোকে,
ধুলো উড়ে যায়,
আলো পড়ে-
আর আমি দেখি,
আমি এখনও ভেঙে পড়িনি পুরোপুরি।
আজ আর আয়নাকে প্রশ্ন করি না।
আমি নিজেকেই করি।
আমি কি সত্য বলছি?
আমি কি ভয়কে সিদ্ধান্ত নিতে দিচ্ছি?
আমি কি ভালো থাকার অভিনয় করছি,
না সত্যিই ভালো হতে চাইছি?
আত্মপ্রতারণা সহজ।
সত্য কঠিন।
কিন্তু
আমি এখন কঠিন পথটাই বেছে নিতে চাই।
কারণ
নিজেকে হারিয়ে জেতার চেয়ে
নিজেকে খুঁজে পেয়ে হারা
অনেক বেশি সৎ।