একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি যতটা শক্তিশালী হয়, তার পেছনে ততটাই কার্যকর ভূমিকা রাখে একটি স্বাধীন, সৎ ও নির্ভীক সংবাদমাধ্যম। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে সেই নির্ভীক সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আনিস আলমগীরের মতো সাহসী ও আপসহীন সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত হচ্ছে।
আনিস আলমগীর ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতার চোখরাঙানিকে ভয় পাননি, সুবিধাবাদের পথে হাঁটেননি। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অবিচল। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-যেই হোক না কেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরতে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল তথ্যনির্ভর, যুক্তিনিষ্ঠ এবং নৈতিকতায় বলীয়ান। তিনি ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে কাভার করতে গিয়ে দেশ জুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
আজকের বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখি-অনেক সাংবাদিক সত্য জানেন, কিন্তু বলেন না; লেখেন, কিন্তু পুরোটা লেখেন না। এর পেছনে রয়েছে নানা চাপ, ভয় ও স্বার্থের সমীকরণ। এমন অবস্থায় আনিস আলমগীরের মতো সাংবাদিকরা একটি আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখান—সাংবাদিকতা আসলে কী হওয়া উচিত।
একজন সৎ সাংবাদিক কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না; তিনি সমাজের দর্পণ হয়ে ওঠেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করেন এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেন। আনিস আলমগীর সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন বলেই তিনি আজও মানুষের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য আনিস আলমগীর হতে পারেন অনুকরণীয় আদর্শ। সাংবাদিকতা যে কেবল পেশা নয়, এটি যে একটি দায়িত্ব ও ব্রত-এই বোধ জাগ্রত করতে তাঁর মতো মানুষের জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের স্বার্থেই আমাদের আরও আনিস আলমগীর দরকার-যাঁরা ভয় নয়, সত্যের পক্ষ নেবেন; সুবিধা নয়, ন্যায়কে অগ্রাধিকার দেবেন। তাহলেই একটি সুস্থ, সচেতন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক হলেও চিরন্তন সত্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে মানুষের বাকস্বাধীনতা ও কন্ঠস্বরকে দমন করার নীতি। যা বর্তমান সময়েও চলমান আছে। রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিরোধীদের দমন করার জন্য। স্বাধীনতার পর থেকে প্রত্যেক সরকারই কমবেশি এই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করে আসছে । এর ফলে প্রত্যেক সরকারই কর্তৃত্ববাদী সরকারে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতভাবে কোনো সরকারই জনগণের সরকার হয়ে গড়ে ওঠেনি। গত রবিবার সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে রাতভর ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে আটক রাখার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ওই মামলায় অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে আদালতে হাজিরের পর আনিস আলমগীরকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এই গ্রেফতারের ঘটনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। এ ধরনের গ্রেফতার ভিন্নমত দমনের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে, মন্তব্য করেছে আইন সালিশ কেন্দ্র সংস্থাটি । টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, যে যুক্তিতেই আটক করা হোক না কেন এটি প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার ভুল বার্তা দিচ্ছে। এ ধরনের গ্রেফতার অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের নিকট প্রশ্নবিদ্ধের সম্মুখীন হয়েছে।
টিআইবির পক্ষ থেকে গত ৯ ডিসেম্বর কর্তৃত্ববাদের পতন- পরবর্তী বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে চলতি বছর পহেলা নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে কমবেশি ৪৭৬টি ঘটনায় ১০৭৩ জন গণমাধ্যম কর্মী হামলা মামলা হত্যা হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, তারা তিনশর বেশি সাংবাদিককে মামলার আসামি করার তথ্য পেয়েছেন। এছাড়া চলতি বছরের নভেম্বরের শুরুতে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের এ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, " জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পর হত্যা ও সহিংসতা মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে আছেন অন্তত ২৯৬ জন সাংবাদিকের নাম। মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে,"বিশ্লেষণ দেখা গেছে, জুলাইয়ে নিহতদের ত্যাগের বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে মামলাগুলো রাজনৈতিক লড়াইয়ে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে"। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫২৩টি সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। সরকার আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার করে সমাজে সমালোচনা না করার বার্তা দিয়েছে। আমাদের দেশে যে সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তাঁরা বুঝেও বোঝেনা গণতন্ত্র কী এবং কেন? সমালোচনা করা মানেই বিরোধী নয়, বরং সরকারের ভুলত্রুটি স্মরণ করিয়ে দেয়া। যাতে সরকার ভুল সংশোধন করে কাজ করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম ভাষণে সবাইকে মন খুলে সমালোচনার আহ্বান করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, "সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি আপনারা মন খুলে সমালোচনা করেন। আমরা সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরাও আশা করেছিলাম ১৪০০ শহীদের রক্তের ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত এই অন্তবর্তী সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এই অধিকার খর্ব করে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মুক্ত গণমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত দমনে অব্যাহত বল প্রয়োগ, আইনের অপপ্রয়োগ ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় অপব্যবহারের দায় অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারেনা। ফ্যাসিস্ট
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম হত্যা ও ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু চলমান সময়েও তারই ধারাবাহিকতায় আবারও ভয়ের সংস্কৃতি চালু হচ্ছে এবং এর সাথে মব সন্ত্রাস যুক্ত হয়েছে। এটা জাতির জন্য শুভ নয়। সর্বজনীন কল্যাণে সরকারের উন্নতিশীল চিন্তা করা উচিত। সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
এম এ আলীম সরকারঃ লেখক ও রাজনীতিবিদ।