ডাক নাম আর আসল নাম মিলিয়ে তিনি মোখলেসুর রহমান সিধু ভাই।সিধু ভাই নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর আরেক নাম আছে বলে মনেই হয় না। কিন্তু তার আরেকটি নাম আছে মোখলেসুর রহমান।সারা দেশে রাজনৈতিক মহলে বিশেষ করে প্রগতিশীল মহলে সিধু ভাই একটি পরিচিত নাম। তিনি সব সময় প্রগতির পথেই হেঁটেছেন। কাগমারী সম্মেলনে মাওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মতপার্থকের উত্তপ্ততার মধ্যে সিধুভাইর রাজনীতিতে প্রবেশ।
কাগমারী সম্মেলন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের অনতিদূরে কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহবান করেন। এই কাউন্সিল অধিবেশন কাগমারী সম্মেলন নামে পরিচিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে কাগমারী সম্মেলনের তাৎপর্য অপরিসীম। কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে বৈষম্যের প্রশ্নে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতপার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সম্মেলনেই মাওলানা ভাসানী হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন ঃ ‘পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ যদি বন্ধ না হয়, তবে দূর ভবিষ্যতে এমন দিন আসবে, যখন পূর্ব পাকিস্তান হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানকে জানাইবে আস সালামু আলাইকুম। এ অবস্থায় দলের ভাঙন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষিতে ১৯৫৭ সালের ২৪ ও ২৫ জুলাই ঢাকায় রূপমহল সিনেমা হলে দুদিন ব্যাপী ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয়। মোখলেসুর রহমান সিধু ভাই ন্যাপের সাথে যুক্ত হন। সিধু ভাই’র তৎপরতা ও প্রভাবে তাঁর জন্মস্থান রংপুর জেলায় ন্যাপ সংগঠন গড়ে ওঠে।
সিধু ভাই’র কাছে দেশের মানুষ খুব প্রিয় ছিলেন। তিনি মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। মানুষের কথাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলো তাঁর ভাবনার বিষয়। দেশের সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক কর্মকান্ড, আনন্দ-বেদনার সব রকম কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সিধুভাই। দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে, গণমানুষের মঙ্গল কল্যাণের ভাবনা করতেন।
ভাষা আন্দোলন বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম এবং সবচাইতে বড় সূচক ঘটনা।এতে শক্তি যুগিয়েছে, প্রেরণা যুগিয়েছে রবীন্দ্র শতবর্ষ উদযাপন। রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। আইয়ুবের সামরিক শাসনের মধ্যে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন মানে পাকিস্তানকেই চ্যালেঞ্জ। এগারো দিনের উৎসব আইয়ুবের এবং আইয়ুবপন্থীদের ঘুম-নিদ কেড়ে নিয়েছিলো। সিধু ভাই যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্র শত বার্ষিকী অনুষ্ঠান আয়োজনে। অনুষ্ঠানের সম্মিলিত শক্তিকে ধরে রাখতে সিধু ভাই তৎপর ছিলেন। একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিলো তাঁর। সেই কাঙ্ক্ষিত আন্দোলন 'ছায়ানট' যার জন্ম সিধু ভাই’র বাড়িতে। নামটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা হাসানের দেওয়া। সিধু ভাই মনে করতেন রাজনীতিকে সার্থক করে তোলার স্বার্থেই সংস্কৃতিকে যুক্ত করতে হবে এর সঙ্গে। এই তাগিদ থেকেই ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণে এগিয়ে যান সিধু ভাই। বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারায় এদেশের মানুষকে সংযুক্ত করার প্রেরণায় তিনি সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ রাত্রে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর সিধু ভাই’র গুলশানের বাড়ি একটি গোপন শিবিরে পরিণত হয়েছিলো। এখান থেকে বিপদগ্রস্ত মানুষদের পালিয়ে যেতে, গোপনে থাকার ব্যবস্থা সহ সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হতো। মুক্তি সংগ্রাম যখন সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয় তখন সিধু ভাই ঢাকায় থেকে যান। তিনি হানাদারদের তৎপরতার সংবাদ এবং নগদ অর্থ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠাতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সংগঠক হয়ে ওঠেছিলেন।
১৯৫৭ সালে ‘সংখ্যা সাম্য নীতি’ ও সামরিক জোটে যোগদানের বিতর্কে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হবার সময় সিধুভাই’র একটি বিশিষ্ট ভূমিকা ছিলো। সিধু ভাই বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসতেন, বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি সর্বদা চিন্তিত থাকতেন। বাংলাদেশকে ভালোবাসার টানেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন।
সিধু ভাইয়ের ছোট ভাই মশিউর রহমান যাদু মিয়া ভাসানীর অনুসারী ছিলেন এবং ভাসানী ন্যাপের বড় নেতা ছিলেন, সাধারণ সম্পাদকও হয়েছিলেন। মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়েই জীবনকে দেখেছেন, জীবনকে সেভাবে পরিচালনা করেছেন সিধু ভাই। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিলো মানুষই।
অবস্থা সম্পন্ন জোতদার শ্রেণীর মানুষ হয়েও তিনি দীন-দরিদ্র গরিব মানুষের পক্ষের মানুষ ছিলেন। সিধু ভাই ৮৭ বছর ২৮ দিন বেঁচে ছিলেন। তাঁর জন্ম ১৫ মার্চ ১৯২১ সালে। মৃত্যু হয় ১৫ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে। তাঁর গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলায় খগাবাড়ি গ্রামে। পিতার নাম মোঃ ওসমান গণি। শৈশবে পেটের পীড়ায় তিনি দুধমা’র দুধ খেয়ে বেঁচেছেন।
সূত্র- সহায়িকা স্মরণীয় জন, সম্পাদনা ঃ মোতাহার হোসেন সুফী, প্রকাশকাল ঃ জানুয়ারি ১৯৯০।