[মোখলেসুর রহমান ১৯২১ সালে রংপুর জেলার নীলফামারী মহকুমার ডিমলা থানার খগাখড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম সিধু মিয়া। তিনি ছিলেন এক বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁদের পরিবার জোতদার হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে তিনি কলকাতা, ঢাকা ও চট্রগ্রামে ছিলেন অনেক দিন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক আন্দোলনে কখনো প্রত্যক্ষ, আবার কখনো পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে তাঁর ভাই মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে বুদ্ধি-পরামর্শ সহযোগিতা করেছেন। একজন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ।
এ সাক্ষাত্কারে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক অ্যাডমিরাল আহসানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শিল্পপতি আমিন ও আদমজীর রাজনৈতিক সম্পর্ক, তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে অবাঙালিদের একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের মূল্যায়ন, ভাসানীর কথা, বিএনপির গঠন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ভাই যাদু মিয়ার সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাদু মিয়ার সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসকি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম।গৃহীত সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতেই বর্ণনা আকারে এ রচনাটি ছাপা হলো। আর প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ছিলেন ইতিহাসবিদ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ।)
পর্ব-৯ (গতকালের পর)
২৪. ফাতেমা জিন্নাহর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা
ফজলুর রহমান সাহেব তখন করাচি থেকে ঢাকায় এসে বসবাস করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি কেবল নিজে থাকেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা থাকে করাচিতেই। সেবার তিনি এখানে এলে আমি একদিন তাঁর সঙ্গে এমনিই দেখা করতে যাই। আমি তাঁর সঙ্গে রাজনীতি না করলেও সামাজিক সম্পর্ক রাখতাম। ঈদের আগেই তিনি চলে যাবেন বলে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম।
আমি বললাম, ‘আপনি যে যাচ্ছেন, কদিন পরে আসবেন?’
আমাকে বললেন, ‘বলো তো, এই আইয়ুবের বিরুদ্ধে কাকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো যায়?’
আমি বললাম, ‘প্রার্থী তো আপনার জানাশোনার মধ্যেই আছে।’ কথাটা আমি হঠাত্ করেই বলে ফেললাম।
শুনে বললেন, ‘কে আছে আমার জানাশোনার মধ্যে?’
আমি বললাম, ‘ফাতেমা জিন্নাহ।’
বললেন, ‘বলো কী, ফাতেমা জিন্নাহ!’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তিনিই একমাত্র প্রার্থী হতে পারেন।’
তিনি বললেন, ‘আসবে না।’
বললাম, ‘তাঁকে একটা কথা বলেন যে আপনি কি আপনার ভাইয়ের মতো কেবল বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন, না পাকিস্তান কী পর্যায়ে আছে, সে ব্যাপারে আপনার কি কোনো দরদ-টরদ কিছু নেই? আর যদি দরদ থাকেই, তাহলে আপনাকে কিছু করতে হবে।’
তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, যাই।’
ঈদের নামাজ পড়ার পর তিনি ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন।
দেখা করে এসব কথা তাঁকে বললেন। প্রথমবার কোনো ধরনের সাড়া দেননি। তারপর যখন কোরবানির ঈদে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, তখন আবার কথাটা বললেন।
ফাতেমা জিন্নাহ তখন বলেছিলেন, ‘তুমি এসব কী বলছ ফজলুর রহমান?’
ফজলুর রহমান সাহেব তখন একটু সাহস সঞ্চয় করে বললেন, ‘এ দেশকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে তো আরও একটু সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’
সেবারও ওই পর্যন্তই কথা হয়েছিল। এরপর উনি আরও দু-তিনবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ফাতেমা জিন্নাহকে রাজিই করিয়ে ফেললেন।
অ্যাবডিকেশন অব আইয়ুব খান বাই আলতাফ গওহর শিরোনামে একটা বই আছে, ওই বইয়ে লেখা একটা কথার জন্য আমি তার উল্লেখ করছি। সেখানে আলতাফ গওহর লিখেছিলেন, ‘ফাতেমা জিন্নাহ যে প্রার্থী হবেন, আমরা সেটা জানতেই পারিনি, দিস ওয়াজ অ্যা সারপ্রাইজ টু দেয়ার ক্যাম্প।’
আসলে ব্যাপারটাকে চূড়ান্তভাবে গোপন রাখা হয়েছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে তা প্রকাশ করা হয়েছিল। তারপর তো যে সাড়া বা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা তো আপনারা চোখের সামনেই দেখেছেন এবং ওখানে মানে পশ্চিম পাকিস্তানে কালারাগের নওয়াব ছাড়া আইয়ুবকে আর কেউ বাঁচাতে পারত না। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো ভোটই দিতে দেননি। সেখানে তিনি আইয়ুবের পক্ষে যাতে ভোট পড়ে, সে লক্ষ্যে জোরজবরদস্তি করেছেন।
এখানে এমন একটা ঘটনার কথা আমি বলতে চাই, যেটা কেউ জানতেন না। অথচ আমিও তখন ওই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই খাটাখাটনি করছিলাম। ফজলুর রহমান সাহেবও খাটছিলেন। কিন্তু, আমি তখন শুনেছিলাম যে মুসলিম লীগের মধ্যে কিছু কিছু লোক ভেতরে ভেতরে একটা ছায়া মন্ত্রিসভা তৈরি করে ফেলেছিলেন। কারণ, তাঁরা স্থির ছিলেন যে ফাতেমা জিন্নাহ জিতে যাবেন এবং তিনি জিতে গেলে যে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, সে সংক্রান্ত খবরটা প্রকাশ হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে মওলানা ভাসানীকে আনা হয়েছিল, আওয়ামী লীগকেও আনা হয়েছিল; কিন্তু তাঁদের মধ্যে সব সময় একটা দ্বিধা ছিল যে ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচনে জিতলে মুসলিম লীগকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হবে না তো? এ কারণেই তাঁরা ইতস্তত করতে লাগলেন। কিন্তু যখন তাঁরা এটা জানলেন যে তলে তলে একটা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়ে গেছে, তখন তাঁরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে যা হতে চলেছে, তা মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে, যে মুসলিম লীগকে আমরা ১৯৫৪ সালে পরাজিত করেছিলাম। ফলে ভাসানী এবং আওয়ামী লীগ পিছিয়ে গেল।
২৫. ইত্তেফাক প্রসঙ্গ
আরেকটা ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এই সময়ই আইয়ুব খান চিঠি লিখে মওলানা সাহেবকে জানালেন যে ‘আমি একটা কাজ করতে চাই। ইত্তেফাক তো আসলে আপনারই কাগজ ছিল। পত্রিকাটিকে আবার আমি আপনার কাছে ফেরত দিতে চাই। আপনি ওটা নিয়ে নেন।’ মওলানা সাহেব আমাকে বললেন, ‘এর একটা জবাব দিয়ে দাও।’
আমি বললাম, ‘আপনি বলেন, জবাবে কী লিখতে হবে?’
মওলানা সাহেব বললেন, ‘দেখ, ইত্তেফাক পত্রিকার আমিই প্রতিষ্ঠাতা ছিলাম। কিন্তু পত্রিকাটির যা কিছু উন্নতি, সেটা তো আর আমি করিনি। সে কাজটা করেছেন মানিক মিয়া১৭ এবং অন্যরা। আজকে ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা এবং তার গ্রাহকসংখ্যাও অনেক। বেশ ভালো কাগজ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। আমি তো আর কাগজ পরিচালনা করি না, এখন আর ওটা আমার ফিরে পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। তা ছাড়া আমি নিতেও চাই না। বর্তমানে যারা আছে, তারাই চালাক। তারা পত্রিকাটিকে কোনো দিন দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না বলে আমি আশা করি। নিজেদের একান্ত স্বার্থে ব্যবহার করবে না বলেও আমি আশা করি। কাজেই যেভাবে চলছে, তাতেই আমি সন্তুষ্ট। ওসবের মধ্যে আমি আর ফিরে যেতে চাই না।’
মওলানা সাহেবের আরেকটা গুণের কথা বলতে চাই। সেটা হলো, খবরের কাগজের প্রতি তাঁর একটা বড় দুর্বলতা ছিল। তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে সংবাদপত্র ছাড়া রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতবাদ প্রচার করা এবং দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা সম্ভব নয়। তিনি ‘ন্যাপ’ গঠন করার পরপরই একদিন আমাকে অনেক রাতে ডেকে আমার হাতে সাত হাজার টাকা তুলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি একটা কাগজ বের করো।’
আমি বললাম, ‘আমার তো কাগজ বের করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমি এই টাকা দিয়ে কী করব? তা ছাড়া এ টাকা আপনি পেলেন কোত্থেকে?’
বললেন, ‘টাকাটা আমি তোমাকে দিচ্ছি। তোমার কাছে রাখো। একটা পত্রিকা বের করতে হবে। তার প্রারম্ভিক কিছু খরচাপাতি লাগবে। এই টাকাটা সেই কাজে লাগিয়ো।’
যা-ই হোক, এ কথা শোনার পর আমি মওলানাকে বললাম, ‘তা কাগজের নাম কী হবে? আপনি যদি একটু এ ব্যাপারে বলেন!’
কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল খুবই ভালো। সেই সূত্র ধরেই বললেন, ‘এক কাজ কর, নজরুল ইসলামের একটা কাগজ ছিল না ধূমকেতু নামে। ওই নামেই তুমি একটা কাগজ বের করো।’
আমি বললাম, ধূমকেতু তো ধূমকেতুর মতোই উদয় হয়েছিল এবং একইভাবে সে অস্ত গিয়েছিল।
বললেন, ‘তোমারটারও দশা একই রকম হতে পারে। তুমি ওই নামেই চালাও। নাম দাও ধূমকেতু।’ শেষমেশ ঠিক করা হলো, ধূমকেতু নামে একটা পাক্ষিক অথবা সাপ্তাহিক কাগজ প্রকাশ করা হবে। তারই প্রাথমিক খরচাপাতি চালানোর জন্য তিনি আমাকে এই সাত হাজার টাকা দিলেন।
ধারণা করলাম, টাকাটা তিনি সিতারউদ্দিনের কাছ থেকে পেয়েছেন। সেই টাকাই তিনি তুলে দিয়েছেন আমার হাতে। তা-ই দিয়ে প্রারম্ভিক খরচপাতি করে আমরা ধূমকেতু বের করলাম। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কাজী মো. ইদ্রিস। আনোয়ার জাহিদ ও গোলাম মাওলাও এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র রাজনীতির পেছনে যে দর্শন ছিল, রাজনৈতিক দর্শন; তারই প্রতিফলন ঘটানো হতো এই পত্রিকার মাধ্যমে। এটা একটা মতবাদসর্বস্ব কাগজ ছিল। কোনো সংবাদপত্রের চরিত্র ছিল না ধূমকেতুর। এর মধ্যে কিছু কিছু লেখা এবং কার্টুন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল হওয়ায় পত্রিকাটা আর চালানো যায়নি। কাজেই আপনাআপনি ওটাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
সাধারণ মানুষের লোক বলে পরিচিত হওয়ার একটা বাসনা পৃথিবীর প্রায় সব বড় মানুষেরই ছিল। রবীন্দ্রনাথ এ জন্য তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক’।
মওলানা ভাসানীর কিন্তু কষ্ট করে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে পরিচয় দেওয়ার কিছুই ছিল না। কেননা, ওনার সাধারণ লোকের ঘরেই জন্ম। সাধারণ লোকের স্বার্থের জন্যই কাজ করে গেছেন এবং সাধারণ মানুষের নেতা বলেই সাধারণ মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছিল। মাঝেমধ্যে তিনি কোমর একটু-আধটু দুলিয়েছিলেন বটে কিন্তু মাথার কলসিটা ঠিকই ছিল। অর্থাত্ তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো দিন কোনো কাজ করেননি।
একেবারেই সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁকে ঢাকায় এবং তাঁর কাগমারি অথবা তাঁর পাঁচবিবির বাড়িতে দেখেছি যে হাজার হাজার লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত। উনি তাদের পীরও ছিলেন।
মওলানা ভাসানী বাংলা এবং উর্দু দুটো ভাষাই জানতেন। এবং দুটো ভাষাতেই ভালো বক্তব্য দিতে পারতেন। আমি তাঁকে করাচিতে এবং অন্য নানা জায়গায় অবাঙালি শ্রোতাদের মধ্যে বক্তব্য দিতে শুনেছি। সেখানেও তারা, মানে সাধারণ মানুষজন তাঁর বক্তব্য অনেক আগ্রহের সঙ্গে শুনেছে। মওলানা ভাসানীকে তারা তাদের লোক বলেই গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের কোনো নেতাকে আমি এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে এর আগে শুনিনি।
কিন্তু মওলানা ভাসানী একমাত্র নেতা, যিনি আমাদের রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ করলেন। তিনি বড় বড় মিটিংয়ে, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে জোরালো ভাষায় একাত্মতা ঘোষণা করতেন।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জীবনীতে একটা গল্পের উল্লেখ আছে। গল্পটা এ রকমের: একদিন তাঁর এক ভক্ত এসে বিবেকানন্দ সম্পর্কে অভিযোগ করে বললেন যে তিনি এমন কিছু কাজ করে থাকেন যেটা তাঁর করা উচিত নয়। শ্রী রামকৃষ্ণও বললেন, না, ও ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অভিযোগকারী সেই ব্যক্তি কয়েকবারই এসে একই রকমের অভিযোগ করতে লাগলেন। ঠিক এই ঘটনার মুখে শ্রী রামকৃষ্ণ যে গল্পটা বলে শোনালেন, সেটা এ রকমের: গ্রামের কুয়ো থেকে জল আনতে যায় গ্রামের যুবতী তরুণীরা, তখন আশপাশের ছেলে-ছোকড়াও যায় তার সঙ্গে সঙ্গে। তারা শিস ইত্যাদি বাজিয়ে তাদের উত্ত্যক্ত করে, হাসিঠাট্টাও করে। তারপর সবাই জলটল নিয়ে কলসি মাথায় নিয়ে ফিরতে থাকে বাড়িমুখো। ছেলেরা আগের মতোই শিস বাজায়। আর মেয়েরাও কোমর দোলায়। কিন্তু কোনো দিন কি তাদের মাথা থেকে কলসি পড়ে যায়? পড়ে না। বিবেকানন্দও এমনই। তিনি যদি এদিক-ওদিক করেনও, তিনি আমার কাজ ঠিক ঠিকই করে যাবেন। চিন্তার কোনো কারণ নেই।
মওলানা ভাসানীও তেমনি মাঝেমধ্যে একটু কোমর দুলিয়েছিলেন সত্য; কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য তিনি সারা জীবনই লড়াই করেছেন। তাদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি কোনো দিন কিছু করেননি।
মওলানা ভাসানীর যে ব্যাপক পরিচিতি, সাধারণ মানুষের বন্ধু বলে তাঁর যে খ্যাতি কিংবা তিনি নিজেও সাধারণ লোক বলে সাধারণ মানুষজনও তাঁকে তাদের নিজেদের লোক বলে ভাবে—এই যে তাঁর একটা গুণ অথবা এই যে তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁকে সাংগঠনিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় ন্যাপ।
সেই ব্যর্থতার কারণে মওলানা ভাসানীও পরের দিকে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। আসলে এনএপি বা ন্যাপ-এর মধ্যে দুটো ভাগ ছিল। এক ভাগে ছিল বামপন্থী। অর্থাত্ লোকজন যাদের কমিউনিস্ট বলে জানত। তাদের সংখ্যাই ছিল ন্যাপে বেশি। আরেকটা গ্রুপ ছিল ডানপন্থী। বামপন্থীদের নেতৃত্ব দিত কমিউনিস্টরা এবং ডানপন্থীদের নেতৃত্ব দিতেন মাহমুদ আলী এবং অন্যরা। মওলানা ভাসানী এই দুটো গ্রুপের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলতেন এবং মনে করতেন যে কমিউনিস্টদের যে সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করার লক্ষ্যে তাঁদের নিজেদের উত্সর্গ করার যে মনোভাব, তিনি তাঁর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে এটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে মনে করতেন। কিন্তু পরে এ ব্যাপারে তাঁর ভয়ানক মোহভঙ্গ ঘটেছিল।
আরেকটা কারণে তার মোহভঙ্গ হয়েছিল ঠিক তখন, যখন মস্কো কমিউনিস্ট পার্টির চীনের পার্টির মধ্যকার নীতিগত বিরোধের জের ধরে এখানেও কমিউনিস্টরা বিরোধ ও বিভেদে জড়িয়ে পড়ে। তারা একত্রে আর কাজ করতে পারল না। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, মওলানা ভাসানী তাঁর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কমিউনিস্টদের যেভাবে ব্যবহার করবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তেমনটা না হওয়ায় তিনি সত্যি সত্যি হতাশ হয়েছিলেন। ঠিক এই একই কারণে পরে তিনি কমিউনিস্টদের সংস্রব প্রায় ত্যাগ করেছিলেন। ত্যাগ করে তিনি আবার তাঁর ওই প্রাথমিক জীবনের ধর্মীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন। অর্থাত্ আবার সেই ইসলাম পন্থার অনুসারী রাজনীতি শুরু করলেন। পরের দিকে আমার মনে হয়েছিল তিনি ইসলামিক সোশ্যালিজম বা ইসলামিক সমাজতন্ত্র কায়েম করার কথাও বোধ হয় বলতে শুরু করেছিলেন। ফলে এ কথা সম্ভবত বলা যায় যে যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করতেন, তাঁদের ব্যর্থতার কারণেই, তাঁদের মধ্যকার চরম বিভেদের কারণেই মওলানা ভাসানী আবার এসব কিছুর মধ্যে চলে গিয়েছিলেন।
মওলানার বিশাল সব সম্মেলন, ন্যাপের সম্মেলন, কৃষক সম্মেলন—এ-জাতীয় সব সম্মেলনে প্রচুর লোকসমাগম হতো। যেসব লোক আসত, তাদের আবার রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের একটা কাজের মধ্যে নিয়ে আসার যে ব্যাপারটা, সেই কাজটা মওলানা করতে পারতেন না। এই লোকগুলোকে তিনি যে ন্যাপে ডেকে আনলেন কিংবা তাঁর কর্মীদের মধ্যে নিয়ে এলেন, তাদের সংগঠিত করে একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারা একটা বিরাট ব্যর্থতার ব্যাপার।
মওলানা ভাসানী নিজে কোনো দিন এভাবে সংগঠন করতে পারেননি, অন্তত আমি যখন থেকে তাঁকে জানতাম, তত দিন পর্যন্ত পারেননি। তিনি সংগঠন করতেন না, সে ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। দেখেছি, তিনি বিশাল সব কৃষক সম্মেলন ডাকছেন—পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব বড় বড় নেতা তাতে যোগ দিলেন, লাখ লাখ লোকসমাগম হলো। কিন্তু তিনি কেন ডাক দিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। তাঁরা এসেছেন মওলানা সাহেব ডেকেছেন বলে। সাধারণ মানুষজন এসেছেন তাঁদের ‘পীর’ বা ‘হুজুর’ ডেকেছেন বলে। কেন তাঁরা যোগ দিলেন, কৃষক সমিতির উদ্দেশ্যটা কী, তাঁদের কেন ডাকা হলো—বলার আগেই তাঁর গলা ভেঙে গেল, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর তাঁর দলভুক্ত নেতা-কর্মীরা, কৃষক ও শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা-কর্মীরাও রাজনৈতিকভাবে এসব কিছুকে যথাযথ কাজে লাগাতে পারলেন না। আর তেমনটা না করতে পারার জন্য শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে এত বড় একটা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও তার কোনো প্রভাব পড়ল না। এটা একটা মস্ত বড় ব্যর্থতা। এটা কেবল তাঁর নিজের ব্যর্থতা নয়, তাঁর দলভুক্ত অন্যান্য ফ্রন্টের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি অন্য আর যাঁরা এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদেরও ব্যর্থতা।
জনগণের অভাব-অভিযোগ সাম্প্রতিক কালে অনেক বেড়েছে। লোকজন কথায় কথায় বলে থাকে যে, মওলানা ভাসানীর মতো কেউ যদি থাকত, তাহলে এখন আমাদের এমন দুর্দশা হতো না। যখনই জনসাধারণের তরফ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ উঠেছে, তার দুর্ভোগের শিকার হয়েছে, তখনই তার প্রতিকারের আশায় তারা ভাসানী সাহেবের কাছে ছুটে গেছে। এ রকমটা যখনই হয়েছে মওলানা সাহেব সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রে একটা বিবৃতি দিয়ে দিতেন। সেই বিবৃতি ছাপানোর সঙ্গে সঙ্গেই যারা দেশের কর্তা ছিলেন, তাঁদের টনক নড়ে যেত। তাঁরা দ্রুতই মওলানার উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানে তত্পর হতেন।
এমনও দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের দাবি জানাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে পথে নামলেই মওলানা সাহেবও তাদের কাতারে শামিল হতেন। তিনি এ ধরনের কোনো মিছিল বা সমাবেশে গেলে, ফলাও করে সেটা প্রচারও করা হতো। মানুষ জানত, কেন মওলানা ভাসানী পথে নেমেছেন সাধারণ মানুষকে তাঁর সঙ্গী করে।
আজকে এত অভাব-অভিযোগের পর মানুষ কাউকে তাদের পাশে পায় না। মওলানা ভাসানীর অবর্তমানে একটা রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। আজকে মানুষ জানে না কার কাছে গেলে তাদের অভাব-অভিযোগের প্রতিকার হবে। আজকে মওলানা ভাসানীর সম্পর্কে অনেক কথা বলা যায়, তাঁর সমালোচনাও করা যায়। কিন্তু এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে মওলানা ভাসানী বজ্রকণ্ঠে যে প্রতিবাদ করতেন, সেই প্রতিবাদে শাসনকর্তাদের আসন টলে উঠত। এই একজন মানুষের অভাব, দেশের সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে। এই অভাব যে কোনো দিন পূরণ হবে, এমন কোনো আশার আলো আমরা দেখছি না। দেশে যে শুধু রাজনৈতিক শূন্যতাই আছে, তা নয়, নেতা ও নেতৃত্বেরও শূন্যতা আছে। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর নেতৃত্বের যে শূন্যতা, সেটা পূরণ হবে বলে মনে হয় না।
টিকা
১. তেভাগা আন্দোলন বাংলার ইতিহাসের একটি কৃষক আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে বাংলার রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গে এ কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল উত্পন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ পাবেন চাষি এবং এক ভাগ পাবেন মালিক। তেভাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল ‘জান দেব তবু ধান দেব না’।
২. ফজলুর রহমান (১৯০৫-১৯৬৬) একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৩৩ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো এবং ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা শহর থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার চিফ হুইপ ও ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর লিয়াকত আলী খানের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা, বাণিজ্য ও শরণার্থী পুনর্বাসন, খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা ও বাণিজ্য ও আই আই চুন্দ্রীগড়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য, অর্থ ও আইনবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি পূর্ববঙ্গ পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, বঙ্গীয় রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পাকিস্তান হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার এবং আরবি হরফে বাংলা লেখার অন্যতম প্রবক্তা।
৩. ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যত্ সংবিধান রচনার ব্যাপারে ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ভারত সচিব লর্ড প্যাথিক লরেন্স ও নৌ-প্রধান আলেকজান্ডারকে নিয়ে তিন সদস্যের যে প্রতিনিধিদল ভারতে আসে, তা-ই ক্যাবিনেট মিশন নামে পরিচিত।
৪. আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৭৪) একজন চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ। পড়াশোনা শেষে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৬ সালে বঙ্গীয় বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে বর্ধমান জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি, ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মকুশলতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাম্যবাদী আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তরুণসমাজ ব্যাপকভাবে লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়। ফলে মুসলিম লীগ একটি গণসংগঠনে পরিণত হয় এবং ১৯৪৬ সালের বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ও গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ মাস কারাজীবন ভোগ করেন। মুক্তি পাওয়ার পর খেলাফতে রব্বানী পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে ইসলামিক একাডেমির প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে মুসলিম লীগের রাজনীতি পরিত্যাগ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
৫. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী দলসহ সমমনা দলগুলোকে নিয়ে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করা হয়। এটি যুক্তফ্রন্ট নামে পরিচিত। যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক ২১ দফা তাদের নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ঘোষণা করে।
৬. মসিউর রহমান (১৯২৪-১৯৭৯) একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। পঞ্চাশের দশকে মুসলিম লীগের রাজনীতি ত্যাগ করে মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছয় দফা দাবির বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে প্রথমে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ ও পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। স্বাধীনতার পর দালাল আইনে গ্রেপ্তার হন। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে যোগ দেন। মসিউর রহমান যাদু মিয়া নামে পরিচিত। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও বাগ্মী হিসেবে খ্যাতি ছিল।
৭. ১৯৪১ সালের নভেম্বরে মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার থেকে মুসলিম লীগের বেরিয়ে যাওয়ার পর এ কে ফজলুল হক ও তাঁর মন্ত্রিসভা ৭ ডিসেম্বর ইস্তফা দেয়। ফজলুল হককে সংগঠন ও মুসলিম কার্যবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফজলুল হক ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ৪৩ জন সদস্য নিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম লীগে রয়ে যান এবং বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন। নতুন মন্ত্রিসভায় ফজলুল হক ছাড়াও চারজন হিন্দু ও চারজন মুসলিম সদস্য ছিলেন। উগ্র হিন্দু মহাসভার নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে কেউ কেউ এ মন্ত্রিসভাকে ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভা নামে অভিহিত করেন।
৮. হামিদুল হক চৌধুরী (১৯০১-১৯৯২) একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের মনোনয়নে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত নির্ধারণে র্যাডক্লিফ কমিশনের সদস্য হন। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় আগমন। ১৯৪৯ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক সরকারের অর্থমন্ত্রী, ১৯৫৩ সালে শেরেবাংলার নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন ও এর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য গঠিত শান্তি কমিটির শীর্ষ নেতা ছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা।
৯. ফরিদ আহমদ (১৯২৩-১৯৭১) একজন রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান সরকারের ভাষানীতির প্রতিবাদে এবং ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ঢাকা কলেজের অধ্যাপনার চাকরিতে ইস্তফা দেন। ১৯৫৪-১৯৬৯ পর্যন্ত নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য, ১৯৫৭ সালে চুন্দ্রীগড় মন্ত্রিসভার শ্রমমন্ত্রী, ১৯৫৬ সালে কক্সবাজার মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, ১৯৬২ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে উপনির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন ও মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণাকাজে অংশ নেন। ডাক এর বিশিষ্ট সদস্য হিসেবে ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দল গঠনে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন ও নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে জনগণ কর্তৃক ধৃত ও বিক্ষুব্ধ জনতার প্রহারে নিহত হন।
১০. জিতেন ঘোষ (১৯০১-১৯৭৬) একজন লেখক ও রাজনীতিবিদ। ছাত্রাবস্থায় অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে কলেজজীবন ত্যাগ করেন। ছাত্রাবস্থায় যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৫ সালে বিপ্লবী পার্টির সংগঠক হিসেবে বার্মায় গমন ও সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৩০ সালে দেশে ফেরার পর ১৯৩১ সালে গ্রেপ্তার এবং বিনা বিচারে সাত বছর কারাভোগের পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। ওই বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ও পরের বছর পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪০ সালে আবার গ্রেপ্তার হন ও ১৯৪১ সালে মুক্তি পান। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সময় চাঁদা তুলে বিক্রমপুরে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
১১. জ্ঞান চক্রবর্তী (১৯০৭-১৯৭৭) একজন রাজনীতিবিদ। স্কুল বয়সেই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৩০ সালে গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৮ সালে দেউলী বন্দিশিবির থেকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় গণসাহিত্যচক্র নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন।
১২. ওয়াহিদুজ্জামান (১৯১২-১৯৭৬) একজন রাজনীতিবিদ। ডাকনাম ঠান্ডামিয়া। মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নেন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, বেঙ্গল কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশনের সেক্রেটারি, কলকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলর, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের মনোনীত সদস্য ও নির্বাচিত সদস্য, পাকিস্তান প্রথম গণপরিষদের সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, কনভেনশন মুসলিম লীগের নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে জাতীয় পরিষদের সদস্য ও আইয়ুব মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শেখ মুজিবের ছয় দফার বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেন। হানাদার বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির অন্যতম নেতা ছিলেন।
১৩. শাহ আজিজুর রহমান (১৯২৫-১৯৮৭) একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। অবিভক্ত বাংলার অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। ১৯৫২-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি পক্ষের অন্যতম আইনজীবী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধিতা করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
১৪. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী। পড়াশোনার শেষ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ডেমোনস্ট্রেটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু। কর্মজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী প্রভাষক, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগের প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ আলাদা হলে এর রিডার ও বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক পদে উন্নীত, সুপার নিউমারারি অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।
১৫. খাজা কায়সার (১৯১৮-১৯৮৫) একজন লেখক ও কূটনীতিক। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৪১ সালে ভারতীয় পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে পাকিস্তান ফ