মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৩, ২০২৬

যে স্মৃতি ভোলা যায় না

  • আবু জাফর বিশ্বাস
  • ২০২৫-০৯-২৮ ১৮:৪৮:০৭

বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, নির্মল বায়ু প্রকৃতি ও বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতি। অতীত দিনের সেই স্মৃতি কথা, সেই স্মৃতিমাখা গ্রামবাংলার দিনগুলির কথা এখন খুব মনে পড়ে। যেখানে ছিল চারিদিকে শুধুই সবুজ আর সবুজ, নৈসর্গিক অপরূপ শোভা। বুকভরে শ্বাস নিলে শুধুই নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস, অক্সিজেন। এক একটা শতবর্ষী গাছ ছিল যেন এক একটা অক্সিজেন ফ্যাক্টরি। খেলাধুলার জন্য ছিল পর্যাপ্ত মাঠ, বিস্তীর্ণ পতিত জমি, খড়ের ভূই, বড় বড় আম-কাঁঠালের বাগান। শিতের শেষে সারা মাঠ ফাঁকা, যেন সব বল খেলার মাঠ। গরু ছাগল মাঠে থাকতো এড়া। সারা মাঠে খেলেছি কত যে খেলা! বেশ কিছু খেলার নাম এখন এই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানেই না। আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু সহ বেশকিছু খেলাধুলা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ছেলেবেলা শীতকালে সন্ধ্যার পরে খেজুর গাছের ছোবড়া দিয়ে মশাল বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে দৌড়ানো। এমন কত যে খেলা, সে আনন্দ অনুভূতির কথা এখন ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। 
বর্তমান আমরা সবাই যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি, কিসের নেশায় যেন শুধু ছুটছি আর ছুটছি। কারো কোন অবসর নেই, নেই আগের মত বিনোদন, নেই সেই খেলাধুলা, আর খেলার মাঠ। শুধু খেলার মাঠ নয়; এমন কী ফসলের জমিও প্রায় সব হারিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে বড় বড় ইমারত। গ্রাম বাংলার কত উৎসব এখন আর দেখাই যায় না। সেই জারি-সারি, পালা গান, প্রেণী গান, সুরে সুরে পুথি কিতাব পাঠ এখন আর শোনাই যায় না। বৈশাখী নববর্ষ উৎসব ছাড়াও ছিল হেমন্তের নবান্ন উৎসব। নতুন আমন ধান উঠলে গুঁড়ো কুটে বিভিন্ন রকম পিঠা, আর নতুন খেজুরের গুড়, আহ! মনে করলেই জিহ্বায় জল এসে যায়! আবার যখন চৈত্রের খাঁখাঁ রৌদ্র, চারিদিকে নেই ধান পাট, শুধু ধুধু মাঠ, বৃষ্টির জন্য সবাই গর্ত কেটে তাতে পানি ঢেলে কোলা ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া হতো, আর সবাই কাদা-পানি মেখে; কাদাখেই করে গান ধরা হতো- আল্লাহ মেখ দে পানি দে ছায়া দে-রে তুই আল্লাহ...। তারপর বাড়ী বাড়ী চাল তুলে খির রান্না করে খাওয়া হতো। কোনদিন সত্যিই যেন ঈশান কোণে কালবৈশাখীর মেঘ গুড়গুড় করে ডেকে বৃষ্টি নেমে আসতো। তখন আমাদের আনন্দে বুকটা ভরে যেত। মৃত্তিকা আবার ফিরে পেতো যেন তার পুনর্জীবন, উর্বর মাটিতে গাছগাছালি হতো সবুজ সতেজ। সেই নির্মল বায়ু প্রকৃতি এখন আর নাই, সব কিছুই আজ পরিবর্তন। আমাদের বৈচিত্র্যময় ছয়টি ঋতু এখন আলাদা করে চেনাই যায় না। সেই বড় বড় বৃক্ষও আর নাই। এদিকে ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ায় বাতাস হচ্ছে দূষিত, যানবাহনে হচ্ছে শব্দ দূষণ, পলিথিন ব্যাগ আর রাসায়নিক সারে হচ্ছে পরিবেশ ও ভূমি দূষণ, নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, ডিপ-স্যালোয় বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ, ওদিকে গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এসব কিছুর কারণে পরিবর্তন আসছে আমাদের চিরসবুজ প্রকৃতিতে। এখন পরিবেশের এই বিপর্যয়ের ব্যাপারে আমাদের স্বচেতনতা সৃষ্টি করার কোনো বিকল্প নাই। অধিক পরিমানে গাছ লাগিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে পরিবেশের ভারসাম্য। নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে স্বপ্নভরা আগামী দিনগুলো হোক চিরসবুজ সুন্দর ও সুখের।
আমরা ছোটবেলা যখন কোনদিন স্কুলে যায়নি; তখনও কিছু ইংরেজি জানতাম! সেটা হলো মার্বেল খেলতে গিয়ে যখন আমরা গদখেলা করতাম; মার্বেল এদিক ওদিক চলে গেলে আগে বলতে হবে- স্টেট। আবার সে যদি আগে বলে- নট স্টেট, তাহলে সেখান থেকেই খেলতে হব। এভাবে- কৃশ, নট কৃশ, মাই সাইড, উড্ডীন, হোল্ড, গদে গেলে নট গহ্বর, ইয়েস, নো, ভেরি গুড। এমন সব কথা ঠোঁটের আগায় থাকতো। এই সব শব্দের মানে তখন জানতাম না, তবে সব বুঝতাম। মনে হতো সব বাংলা। আবার যখন গোল্লাছুট খেলতাম, কিছু উর্দু বলতাম। কে কোন দলে খেলবে তা নির্ধারণ করতাম এভাবে- দুজন করে গোপনে রুপক নাম পাতিয়ে নিয়ে আসতো, প্রথমে সামনে এসে বলবে- :উঝকো মুঝকো কিছকো ডাক? দলনেতা- :হাম মারি তোমকো ডাক। তার পর ওই দুজন পাতানো নাম বলবে যেমন- :কে নিবে আকাশ? কে নিবে বাতাস? একজন নাম ডাকবে আমি নিব আকাশ, এবার যার গোপন নাম আকাশ সে তার দিকে চলে যাবে।
আরো এক রকম খেলা ছিল, যে খেলা এখন আর গ্রামগঞ্জেও দেখা যায় না, সেটা হলো- ওপেন্টি বাক্সো। দলনেতা দুজন তাদের চার হাত উঁচু করে ধরে সামনা-সামনি দাড়াবে, আর সবাই ঘাড়ে হাত বেঁধে লাইন দিয়ে হাতের ভিতর দিয়ে যেতে থাকবে। এসময় দলনেতাদ্বয় নিচের ছড়াটি পড়বে, পড়ার শেষ শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথে যে হাতের ভিতর আটকা পড়বে সেই একদিকে এসে বসবে। ছড়াটি হলো এই- 
ওপেন্টি বাক্সো, রাইট এন্ড টেক্সো।
চুলটানা বিবিয়ানা, সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।
কাল বিলেতে যেতে, পানের তামুক খেতে।
পানের মধ্যে মৌরিবাটা, ইসকাপনের ছবি আটা।
আমার নাম রেনু বালা, চলে যাব যশোর জেলা।
কলকাতা মাথা ঘসা, বেলফুল আর চিরনি;
এটে খোঁপা বেঁধে দিব, ফুলের মালা গাঁথুনি।।
 
লেখক- সমাজকর্মী,সাংবাদিক।

 


এ জাতীয় আরো খবর