রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬

মোখলেসুর রহমানের (সিধু ভাই) সাক্ষাত্কারভিত্তিক রচনা 'আমার জীবন-কথা ও সময়'

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৩-০৮-২২ ২৩:৩৫:৪৩

[মোখলেসুর রহমান ১৯২১ সালে রংপুর জেলার নীলফামারী মহকুমার ডিমলা থানার খগাখড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম সিধু মিয়া। তিনি ছিলেন এক বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁদের পরিবার জোতদার হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। পড়াশোনা সমাপ্ত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবনে তিনি কলকাতা, ঢাকা ও চট্রগ্রামে ছিলেন অনেক দিন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব বাংলার সব রাজনৈতিক আন্দোলনে কখনো প্রত্যক্ষ, আবার কখনো পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে তাঁর ভাই মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে বুদ্ধি-পরামর্শ সহযোগিতা করেছেন। একজন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ।
এ সাক্ষাত্কারে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কর্তৃক অ্যাডমিরাল আহসানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ, পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শিল্পপতি আমিন ও আদমজীর রাজনৈতিক সম্পর্ক, তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে অবাঙালিদের একচেটিয়া সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের মূল্যায়ন, ভাসানীর কথা, বিএনপির গঠন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ভাই যাদু মিয়ার সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যাদু মিয়ার সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসকি তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম। গৃহীত সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতেই বর্ণনা আকারে এ রচনাটি ছাপা হলো। আর প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ছিলেন ইতিহাসবিদ ড. সালাউদ্দিন আহমেদ।)

পর্ব-৫ (গতকালের পর)

১২. ভাসানী সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন
আমরা ঢাকায় এলাম। মধ্যখানে রেডিওতে শুনলাম যে এখানে একটা সরকার গঠিত হয়েছে ন্যাপকে বাদ দিয়েই। ন্যাপের একটা বিরাট সম্ভাবনা ছিল এবং মওলানা সাহেবই এই সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। বাধাটা এই অর্থে যে মওলানা সাহেব ১৯৫৪ সালে সংসদীয় ব্যবস্থার রাজনীতিতে যে ধোঁকাটা খেয়েছিলেন, নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে আওয়ামী লীগ তাঁকে যে ধোঁকাটা দিয়েছিল, তাতে তিনি ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আর দ্বিতীয়ত, তাঁর মনে এ রকমের একটা ধারণা ছিল এবং সে ব্যাপারে তাঁকে অনেকেই এই বলে উসকানি দিচ্ছিলেন যে ‘মওলানা সাহেব, আপনি তো পার্টির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন, কিন্তু সরকারপ্রধান তো কোনো দিনই হতে পারবেন না। আপনাকে মই হিসেবে ব্যবহার করে মানুষ ওপরে উঠে যাবে, তারপর আপনাকে লাথি মেরে ফেলে দেবে’—এ রকমের ধারণা তাঁর মাথার মধ্যে সাংঘাতিকভাবে গেঁথে গিয়েছিল। সে সময় ন্যাপের এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল যে বাইরে থেকে যাঁরা ব্যারিস্টার হয়ে আসতেন, এখানে এসেই তাঁরা সোজা ন্যাপে জয়েন করতেন। মানে বেশ কিছু ভালো ব্যারিস্টার ও আইনজীবী ন্যাপের প্রতি এই ভেবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে এই দলটি ভবিষ্যতের দল। এর ভবিষ্যত্ আছে। কিন্তু দলটির এত যে সম্ভাবনা ছিল, মওলানা সাহেব তাঁর নিজের কারণে এই সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিলেন। এবং পরবর্তীকালে এ জন্য আমাদের ওপরই সব দোষ চাপানো হয়। বিশেষ করে, কমিউনিস্টদের ওপর। কিন্তু আমার সঙ্গে কমিউনিস্টদের যে কথাবার্তা হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা একটা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন চাচ্ছিলেন। আমি যখন কৃষক সমিতির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তখন আমি নিজে কৃষক সমিতির কনফারেন্সে তেভাগার অনুকূলে প্রস্তাব পর্যন্ত আনতে বলেছিলাম।
কৃষক সমিতির নেতারা তখন বলেছেন যে না, আমাদের জেনারেল পলিটিক্সটার ভেতর আমরা এখন সেকশনাল পলিটিক্সকে আনতে দেব না। আমরা এখন সত্যিকারভাবেই একটা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন চাই। কাজেই কমিউনিস্টরা ন্যাপের অগ্রগতির জন্য কোনো ধরনের বাধা ছিল না। বাধা ছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি তাঁর নিজের সীমাবদ্ধতা বা ভুলের জন্য এটাকে বাড়তে দেননি এবং বারবার ন্যাপকে নির্বাচনে যেতে দিচ্ছিলেন না। নির্বাচন এলেই বয়কট করার ডাক দিয়ে যাচ্ছিলেন।
আসলে মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন পীর মানুষ। আবার এদিক দিয়ে তাঁর সব রকমের চিন্তার খোরাক জুগিয়ে চলেছিলেন কমিউনিস্টরা। কারণ, কমিউনিস্ট পার্টির যাঁরা কৃষক ফ্রন্টে ছিলেন, তাঁরা তো মওলানা সাহেবের খুব প্রিয় ছিলেন। যেমন: জিতেন ঘোষ১০, জ্ঞান চক্রবর্তী১১—এঁরা সব সময়ই মওলানা সাহেবের সঙ্গে ছিলেন এবং তিনি তাঁদের খুবই মানতেন। তাঁদের কথা শুনতেন। পরের দিকে এসে যেটা হলো, তিনি সরে গেলেন। তাঁর এই বামপন্থী বন্ধুদের কাছ থেকে সরে গিয়ে একেবারেই আবার ইসলামের দিকে চলে গেলেন। তাঁর সত্যিকার দ্বন্দ্বটা এখানেই। তিনি হয়তো চেয়েছিলেন যে ইসলাম এবং সমাজতন্ত্র—এই দুটোকে সমন্বয় করার জন্য। কিন্তু আমার মনে হয় না তাঁর সেই ক্ষমতা ছিল। কারণ, ইসলামের একজন পণ্ডিত হিসেবে তাঁকে কোনো দিন কেউ স্বীকৃতি দেননি। কেবল একজন কৃষকনেতা হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি বা পরিচিতি ছিল। কিন্তু মওলানা হিসেবে তাঁর কোনো স্বীকৃতি ছিল না, পীর হিসেবে ছিল। কিন্তু একজন আলেম হিসেবে তাঁর কোনো ধরনের স্বীকৃতি ছিল না। কিন্তু শেষের দিকে তিনি ওই সব দিকেই ঝুঁকেছিলেন।
আমি তাঁর পড়াশোনা সম্পর্কেও কিছু জানি না। বলতেও পারব না। কারণ, আমার সঙ্গে যে সময় তাঁর পরিচয়, আমি কেবল তাঁর সেই সময়ের কথা বলতে পারব। মওলানা সাহেব সম্পর্কে আরও কতগুলো ঘটনা বলছি।
ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে রিলিজ করার পর উনি আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য সন্তোষে যাওয়ার জন্য খবর পাঠালেন। আমি গেলাম। যাওয়ার পর উনি আমাকে একটা চিঠি দিয়ে বললেন, ‘পড়ো। চিঠিটা আইয়ুব খানের লেখা।’ তাতে তিনি মওলানাকে লক্ষ্য করে বলেছেন যে ‘মওলানা, আমি তোমার কো-অপারেশন চাই। তোমাকে জেলেটেলে রাখতে হয়েছিল, তোমার কমফোর্টের জন্য। সে কারণে তোমাকে আমি ধানমন্ডির বাড়িতে রেখেছিলাম। তখন আমি তোমার বিবিকে অ্যালাও করেছি। সেই গোনার জন্য আমাকে মাফ-টাফ করে দাও। ওটা আমাকে বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। এবং আমি তোমার কো-অপারেশন চাই।’
চিঠিটা আমার কাছে দিয়ে একটা প্যাডের নিচে সই করে দিয়ে বললেন, ‘এর উত্তর তুমি দিয়ে দাও।’
আমি বললাম, আমি কী করে উত্তর দেব? চিঠিটা তো আপনার? আমি কী করে উত্তর দিই?
বললেন, ‘না, তুমি একটা উত্তর লিখে দাও।’ বললাম, মওলানা সাহেব, আমি শুনেছি আপনি অতীতে এ রকম করেছেন কিন্তু আমি তো এটা করতে পারব না। আমি এ রকম কিছুতেই বিশ্বাস করি না। আপনার চিঠি আপনাকেই লিখতে হবে। তবে হ্যাঁ, আপনি বাংলায় আপনার বক্তব্য বলেন, আমি এটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে আপনাকে এনে দেব। তারপর আপনি শুনে সই করবেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলাম।
আলোচনা করলে তিনি বললেন, ‘লিখে দাও যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া আপনার সঙ্গে কোনো সহযোগিতা আমি করতে পারি না।’
আমি বললাম, ঠিক আছে।
তারপর তিনি আরও লোকাল কিছু পয়েন্টস বললেন। আমি পরের দিন তাঁর বলা পয়েন্টগুলো লিখে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। তখন তিনি তাতে সই করে দেন। জবাবি চিঠিতে লেখা ছিল যে ‘প্রভিন্সিয়াল অটোনমি যতক্ষণ তুমি না দিচ্ছো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারি না।’
মওলানা সাহেবের একটা বড় সংসার ছিল। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে তাঁর যে সংসার, তার ব্যয় নির্বাহ করা হতো কীভাবে, সেটা আমি জানতাম না। বলতেও পারব না। তবে এটুকু আমি দেখেছি যে পাঁচবিবিতে মাঠের মধ্যে তাঁর যে একটা বাড়ি ছিল, তার সামনেই তাঁর স্ত্রী, পাঁচবিবিতেই যিনি থাকতেন, তাঁর বাবার একটা বেশ দালানকোঠাওয়ালা বাড়ি ছিল। তাঁরা নাকি তাঁর ওই বউয়ের জিম্মাদারিতে ওই জমিজিরাতগুলো তুলে দিয়েছিলেন। এগুলো থেকেই তাঁর সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা হতো। আর তিনি সন্তোষে যে বাড়ি করেছিলেন, সেটা নয়, আরেকটা বাড়ি ছিল টাঙ্গাইলের বিন্যাবাড়িতে, সেখানে একটা জায়গা ছিল। পোড়াবাড়ী থেকে মাইল দুয়েক ভেতরের দিকে যেতে হতো। পোড়াবাড়ীতে গাড়ি রেখে আমি একবার গিয়েছিলাম। সেখানেও তাঁর স্ত্রীর কিছু জায়গাজমি ছিল।
তবে বড় ধরনের কোনো আর্থিক সহায়তা তিনি আমার কাছ থেকে নেননি। চানওনি কখনো। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাকে যদি তিনি বলতেন, ‘সিধু, আমাকে একটা করাচির টিকিট কিনে দাও’, আমি কিনে দিতাম। কখনো ঈদের সময় বললেন, ‘আমি তো এখন বাড়ি যাব, কী করে খালি হাতে যাই বলো তো?’
আমি বলতাম, ঠিক আছে। হয়তো তাঁর পরিবারের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনে দিলাম। এই রকম অনেকেই করত।
তাঁর অনেক মুরিদ ছিলেন। তাঁরাও আসতেন নানা ধরনের নজরানা নিয়ে। তবে আমি নিজের চোখে তাঁকে নজরানা নিতে দেখিনি। তবে যখনই যেখানে মজলিশ হতো, সেখানে মুরিদরা আসতেন। চাল, ডাল ইত্যাদি সব নিয়ে তাঁরা আসতেন। কেউ টাকাকড়িও নিয়ে আসতেন। মজলিশে আসা মুরিদরা তাঁকে দুই-এক টাকা করে নজরানাও দিতেন। কেউ বা তাঁর কাছ থেকে পানি পড়া নিতেন, কেউ বা নিতেন তাবিজ।
আমি এসব কিছু নিয়ে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি এসব করেন কেন? তাবিজ, পানি পড়া দেন কেন?’
জবাবে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘তারা তো আমার কাছে একটা বিশ্বাস নিয়ে আসে। আমি যখন পানিটায় ফুঁ দিই, আল্লাহর কালাম পড়েই ফুঁ দিই। এই বিশ্বাসে হয়তো ওর কাজ হবে। কিন্তু আমি যদি পয়সাটা না নিই, তাহলে সে ভাববে যে হুজুর পয়সা নেন নাই, তাহলে এটা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। মনে মনে সে বিশেষভাবে আঘাত পাবে। কাজেই আমি পয়সা নিই আর মুরিদদের কাছ থেকে নেওয়া এসব পয়সা তো বাবা আমি আমার নিজের জন্য ব্যবহার করি না। অন্য কারও কাজে আমি টাকাটা দিয়ে দিই।’
পীরগিরিতে তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল কি না, জানি না। তবে আমরা জিজ্ঞেস করলে এই কথাটাই বলতেন যে ‘আমি তো আল্লাহ পাকের কালাম পড়ে ফুঁ দিলাম, ওর এখন যদি তাতে কাজ হয়, তাহলে হবে।’ আমরা যাঁরা মওলানার পেছনে সমবেত হয়েছিলাম, আমাদের মনেও এ রকমের একটা প্রশ্ন জাগত—আমরা যে রাজনৈতিক নেতার পেছনে সমবেত হয়ে কাজ করছি, যিনি কুসংস্কার বিশ্বাস করেন। সত্যি বলতে কি, বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিতে আমরা মওলানার এ-জাতীয় কাজকর্মকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারতাম না।

১৩. প্রসঙ্গ শেখ মুজিব
রাজনৈতিক সময়টা তখন—১৯৫৫-১৯৫৬ সাল, তার পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে ন্যাপ তৈরি হলো, এ সময় পরিসরে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কখনো কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়েছে কি না, এ রকম প্রশ্নের জবাবে বলতে হবে, না, সে রকমভাবে কিছু হয়নি। আমি শুধু একটা কথা বলতে পারি, একদিন আমি নিজে উপযাজক হয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তখন তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর সম্পর্কে অনেক রকমের কথাবার্তা হচ্ছিল তখন। ফলে আমার নিজের কাছেই খুব খারাপ লেগেছিল। আমি একদিন তাঁর কাছে গিয়ে বলেছিলাম যে ‘দেখো, তোমার সম্পর্কে তো নানা রকমের কথাবার্তা হচ্ছে।’
কথাটা শুনে আমাকে বললেন, ‘মোখলেস ভাই, আমি কী করব?’
আমি বললাম, ‘যদি তুমি আমার কথা শোনো তাহলে তুমি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দাও। পার্টির সচিব থাকো। মন্ত্রীর পদটা ছেড়ে দাও। দুটো পদ ধরে রাখায় তোমার সম্পর্কে অনেক রকমের কথা হচ্ছে।’ কথাটা বলেছিলাম হাসতে হাসতেই। কিন্তু শেখ মুজিব সাত দিনের মধ্যেই মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন দলের অর্থাত্ আওয়ামী লীগের সচিবের পদ। ওই একটা দিনই আমি তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। অবশ্য গিয়েছিলাম অন্যের একটা কাজে এবং তখন এই কথাটা তাঁকে বলেছিলাম। কথাটা তিনি রেখেছিলেন।
শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয় গোপালগঞ্জে। আমি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বেরিবেরি অসুখ হলে সেই অসুখে আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়েছিল। একটা নার্সিং টিম হয়েছিল। সেই নার্সিং টিমে শেখ মুজিব ছিলেন। আমি যখন মিশন স্কুলে, তিনি তখন টাউন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন। আমি ওখানে পড়তে গিয়েছিলাম, আমার দুলাভাই আলী আহম্মদ সাহেব তখন ওখানে বদলি হয়েছিলেন বলে। তাঁর সঙ্গেই আমি গোপালগঞ্জে যাই। আমার দুলাভাই তখন সেকেন্ড অফিসার ছিলেন, মানে এসডিওর পরেই তাঁর স্থান ছিল। গোপালগঞ্জের যেসব ঘটনা আমার মনে পড়ে, সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। কারণ, মেদিনীপুর পর্যন্ত আমি হাফপ্যান্ট পরতাম। গোপালগঞ্জে এসে পারিবারিক ইনফ্লুয়েন্সে পড়ে আমাকে ধুতি পরতে হয়। হাফপ্যান্ট আমি পরতে পারি না দশম শ্রেণির ছাত্র বলে। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুও লাগে। সিনিয়র মোস্ট স্টুডেন্ট হওয়ায় আমি এ সময় খুবই মানসিক সংশয়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, গোপালগঞ্জে একটা জায়গা ছিল, যেখানে নমশূদ্র আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংঘাতিকভাবে একটা উত্তেজনাকর অবস্থা বিরাজ করছিল। এই প্রথম এখানে আসার পর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার এই উত্তেজনার ব্যাপারটা আমি দেখেছিলাম। এমন কিছু কিন্তু আমি মেদিনীপুরেও দেখিনি। এসব ঘটনা যখন ঘটছে, তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। সালটা ’৩৪-’৩৫ হবে। এখানে এসে তখন আমি পায়জামা পরা ধরলাম। অথচ আমার পরার কথা ছিল ধুতি। কিন্তু ধুতি পরার সাহসই আমি পেলাম না। আমাকে পায়জামা ধরতে হলো। আর এমনটা আমাকে করতে হলো ওই হিন্দু-মুসলমান টেনশনের জন্য। ওখানে ওয়াহিদুজ্জামান১২ পায়জামা পরতেন কিন্তু শেখ মুজিব পরতেন লুঙ্গি। গোপালগঞ্জ শহরে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা না হলেও কোটালীপাড়া আর যেখানে যেখানে নমশূদ্র আর মুসলমানদের বসবাস ছিল, সেসব জায়গায় প্রায় প্রায়ই একটা দাঙ্গা লেগেই থাকত। এবং সেখানে বিভেদ ও বিভক্তি দিন দিনই বেড়ে যেতে থাকে।
অবশ্য দাঙ্গার কারণ সম্পর্কে আমি অতটা জানতাম না, বুঝতেও পারিনি। কিন্তু দাঙ্গা হচ্ছিল এবং সাংঘাতিকভাবে। মুসলমানেরা আমার দুলাভাইয়ের কাছে আসত। হিন্দুরা চলে যেত কে এল ব্যানার্জি বলে এফএসডিওর কাছে। সম্পূর্ণ সমাজটাই তখন স্পষ্ট দুভাগে বিভক্ত। আমাদের ওঠাবসা ইত্যাদি সবকিছুই ছিল ওই হিন্দু-মুসলমান অফিসার যারা ছিল, তাদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু তার বাইরে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব বলতে ছিলই না। মেদিনীপুরেও আমি এমন কিছু দেখিনি।
যা বলছিলাম, আমাদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য যে টিম গঠন করা হয়েছিল, শেখ মুজিব সেই টিমের সঙ্গে ছিলেন। ফলে ওই বয়সে খুব কাছাকাছি থেকে আমি তাঁকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সপ্তম শ্রেণির সেই ছাত্রের মধ্যে নেতৃত্বের কিছু লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি বেশ বলিষ্ঠভাবে কথাবার্তা বলতেন। আমাকেও তিনি একটু মান্য করতেন। কারণ, তখনকার দিনের সপ্তম শ্রেণির ছেলেরা দশম শ্রেণির ছেলেদের যেভাবে সম্মান করতেন, আমার ব্যাপারেও সেটা তিনি বরাবরই মেনে চলেছেন। এই সময় মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক কোনো ব্যাপারস্যাপার তেমন লক্ষ করা যায়নি। তবে ওই যে সাম্প্রদায়িক ব্যাপার, তার ঘূর্ণিপাকে পড়ে আমরাও প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিলাম। মুজিব একটু বেশিই প্রভাবিত হয়েছিলেন। কারণ, ওর বাড়ি তো গোপালগঞ্জেই। তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ ওই সময়ই দেখা গিয়েছিল। কেবল অসুস্থ আমাকে সেবা করাই না, আমার মতো হয়তো আরও দু-চারজনকে নিশ্চয়ই সেবা করতেন। তা না হলে আরও ছাত্র থাকতে শেখ মুজিব আসবেন কেন আমাকে নার্সিং করতে! নিশ্চয়ই তাঁর এদিকে একটা প্রবল প্রবণতা ছিল।
ওই সব বয়সের ছেলেপেলেদের মধ্যেও নেতৃত্বের, সাংগঠনিক দক্ষতার যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা লক্ষ করা যায়। অনেককে জড়ো করার মতো প্রবণতাও লক্ষ করা যায়! ফুটবল খেলা নিয়েই হোক বা একটা সেবামূলক কাজ নিয়েই হোক, শেখ মুজিবের মধ্যে এ রকম কিছু দেখা গিয়েছিল কি না, আমি বলতে পারব না। কেননা, আমরা দুজন দুই স্কুলে পড়তাম। আমি পড়তাম মিশন স্কুলে, মুজিব পড়তেন টাউন স্কুলে। কাজেই সেভাবে আমি তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জানি না কিন্তু আমার অসুস্থতার সময় তাঁর ওই সেবাকর্মের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন ওহিদুজ্জামান (ঠান্ডা মিয়া) এবং তিনিই শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীদের জোগাড় করে এনেছিলেন।
চল্লিশের দশকে আমি কলকাতায়। শেখ মুজিবও তখন সেখানে। ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন। তখনো তাঁকে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ পাইনি। কারণ, তাঁরা ছিলেন সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের সঙ্গে। আমরা ছিলাম ঢাকা গ্রুপের সঙ্গে। ঢাকা গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন নাজিমুদ্দিন, শাহাবুদ্দিন, ফজলুর রহমান প্রমুখ। আর ওটা, শেখ মুজিবের গ্রুপটা হলো সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে। অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগ সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত ছিল। আমরা ঢাকাকেন্দ্রিক যাঁরা ছিলাম, তাঁরা অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের মধ্যে ছিলাম না। ১৯৪২ পর্যন্ত আমি ছিলাম ঢাকায়। অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ শেষ পর্যন্ত যাদের হাতে গিয়ে পড়ে, সেটা তো প্রো-মওলানা আকরম খাঁ অথবা প্রো-নাজিমুদ্দিনের লোকজনের হাতে, যেমন: আনোয়ার সাহেব, শাহ আজিজুর রহমানের১৩ মতো লোকজনের নেতৃত্বে।
আনোয়ার অবশ্য শহীদ সাহেবের লোক ছিলেন আগাগোড়া। আর শাহ আজিজুর রহমান ওয়াজ নট এ ফ্যাক্টর ইন দ্য মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ।
চল্লিশের দশকে শেখ মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁরা মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ করতেন। কিন্তু ঢাকা থেকে যে ছাত্র আন্দোলন হতো সেটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্পূর্ণ স্বাধীন। ঢাকাতেও স্টুডেন্টস মুসলিম লীগ ছিল বলে যে কথা বলা হয়, এখানে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
একটা ঢিলেঢালা প্রতিষ্ঠান ছিল। ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটি-কেন্দ্রিক একটা প্রতিষ্ঠান। এখানকার ছাত্র কারা কারা আমার সঙ্গে ছিলেন, সে কথা এখন আর মনে পড়ে না।
তবে আমাকে যে রাসটিকেট করা হয়েছিল কেন, সে সম্পর্কে একটু না বললেই নয়।

১৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাসটিকেট
১৯৪২ সালে আমাকে রাসটিকেট করা হয়েছিল। কেননা, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ৩০-৪০ জন ছাত্র নিয়ে ফজলুল হক সাহেব যে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আমরা একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। সেই আন্দোলনটা আমরা করি তখনকার ইস্টবেঙ্গল অর্থাত্ আজকের বাংলাদেশে। আমাকে শহীদ সাহেব তখন নর্থবেঙ্গলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেখানে সবকিছু সংগঠিত করার জন্য। তারপর দু-দুটো উপনির্বাচন হলো। সেটাতে ফজলুল হক সাহেবের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।
এসব কিছু হওয়ার পর ফজলুল হক সাহেব এখানে এলেন। ঢাকার নবাব তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনিই তাঁকে এখানে নিয়ে আসেন। আমরা ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে তাঁকে কালো পতাকা দেখাই এবং মার খাই। শহীদুল্লাহ সাহেব তখন ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট। তিনি সাতজন ছাত্র নিয়ে স্টেশনে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন। আমি তখন ফজলুল হক হলে থাকি। ওইখানে সংসদীয় ব্যবস্থা ছিল। আমি তখন প্রিমিয়ার। আমাদের সমর্থকেরা মিলে ঠিক করল, যে সাতজন ফজলুল হক সাহেবকে অভ্যর্থনা জানাতে গেছে, তাদের মার দিতে হবে।
আমি বললাম, ‘ভাই, আমি কী করে এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে থাকি!’ আরও বলি, ‘আমরা মার খেলাম, যারা আমাদের মার দিল, তাদের আমরা এই বলে বোঝাব, শহরের মধ্যে চলো, মাথায় পট্টিটট্টি বাঁধা আছে, চলো চাখানায় গিয়ে বসি।’ তাদের এভাবে প্রভাবিত করি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার ব্যাপারে অর্থাত্ মারপিট-টারপিট করার ব্যাপারে আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু আমার দলের স্বার্থে আমি বললাম, ‘আমি ডাইনিং হলে বসে বাতি বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যা করার তোমরা কোরো।’
ফজলুল হক হল তখন ছিল মেডিকেল বিল্ডিংয়ের নিচে। ওখানে বেশ ভালোমতোই হামলা চালানো হয়েছিল। তার মধ্যে এ কে নাজমুল করিমের বিছানাপত্র ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মানে সাতজন যারা ছিল, তাদের বিছানাপত্র ইত্যাদি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।
এসব কিছুর জন্য আমাকেই দায়ী করা হলো। আমি এমএ সেকেন্ড পার্ট দিচ্ছিলাম, তার কয়েক দিন আগে আমাকে রাসটিকেট করা হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওটা তুলে নেওয়া হয়েছিল। রাসটিকেট তুলে নেওয়ার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটি আমাকে নিয়োগ দেয়। অ্যাডভাইজরি ব্যুরোর একটা খণ্ডকালীন চাকরি দেয়। তাতে করে আমার একটা সুবিধা হলো যে আমি ওটাও করতাম, পাশাপাশি মুসলিম লীগও করতাম। তবে ঢাকায় নয়, কলকাতায় বসে। ১২ নম্বর ডালহৌসি স্কয়ারে আমার এক কামরার একটা অফিস ছিল, সেখানে একজন ক্লার্ক, একজন টাইপিস্ট এবং একজন পিয়ন ছিল।
১৯৪২ সালের যে ঘটনা ইউনিভার্সিটির ফজলুল হক হলে ঘটছে, শ্যামা-হক মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে, সেই সময় শহীদুল্লাহ সাহেব ছিলেন প্রভোস্ট। শহীদুল্লাহ সাহেবের বিরুদ্ধে তখন মামলা হয়েছিল। আমরা তো মেইন সুইচটা অফ করে দিয়েছিলাম। সুতরাং শহীদুল্লাহ সাহেব ওই কোনার বাড়িতে থাকতেন, যেটাকে তখনকার দিনে চামেলী হাউস বলা হতো। ঘটনা সামাল দিতে উনি আর কাজী মোতাহার হোসেন১৪ সাহেব দুজনেই ছুটে আসেন। শহীদুল্লাহ সাহেব সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে থাকেন। তার হাতে একটা টর্চ ছিল। তিনি সেটা জ্বেলে সবার মুখে মারতে শুরু করেন। ছেলেদের শনাক্ত করার জন্য। এই অবস্থায় একটি ছেলে করল কি, তাঁর হাতে আঘাত করে টর্চটা ফেলে দিল। তারপর শহীদুল্লাহ সাহেবকে নিয়ে একটা ঠেলাঠেলির মতো ঘটনা ঘটে। ফলে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে তিনি নিচের দিকে পড়ে যান। আমি তাঁকে টেনে ধরে তুলি। যদিও আমি ওই ঠেলাঠেলির মধ্যে ছিলাম না। আমি বলতে পারব না তিনি কিসের জন্য হক সাহেবের পক্ষ নিয়েছিলেন। সূত্র- প্রতিচিন্তা।।

(চলবে)


এ জাতীয় আরো খবর