মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬

সৌন্দর্যের এক অনবদ্য ক্যানভাস নগরী-সিলেট ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এলাকা আজ নিদান মরুভূমি!

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৮-১৩ ২৩:৩৫:১৫
ফাইল ছবি

কাশ্মীরী সৌন্দর্য খ্যাত স্বর্গরাজ্যের অনবদ্য ক্যানভাস নগরী সিলেটের ভোলাগঞ্জের সেই সাদা পাথর এলাকা আর সেই সৌন্দর্য নেইরে লাইলা,এখন তা ধুধু মরুভূমি।
দেশে মাটি খেকোদের সাথে তালমিলিয়ে পাথর খেকোদের আবির্ভাব ঘটার সাথে সাথেই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর উধাও লাইলা। কিন্ত এই সৌন্দর্যের এক অনবদ্য ক্যানভাস সৃষ্টি করা সাদা পাথর গেল কোথায়?
ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর ঘেরা ধলাই নদের পাড়ে পর্যটন এলাকাটি কাশ্মীরী স্বর্গরাজ্য খ্যাত সৌন্দর্য্য ছড়ানো এই সাদা পাথর কারা খাইল তুমি কি বলতে পারো লাইলা?লাইলা নির্বিকার,নিরব নিথর পাথরের মূর্তি এক জিন্দালাশ, কোনো উত্তর নেই আজ লাইলার কাছে। 
তবে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ইস্যু আর গনমাধ্যমে উঠে আসছে অহরহ গল্প কথা মন্তব্য আর ক্ষোভ অভিযোগ স্থানীয়সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের বক্তব্য।এনিয়ে এক প্রতিবেদনও পড়লাম,যেখানে বলা হচ্ছে,
"এখানকার ভয়াবহ অবস্থা,আজকে হয়তো লুটপাট নেই।কিন্তু পাথর যা নিয়ে গেছে তাতে এ পর্যটন স্পট মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পাথর বলতে কিছু নেই এখানে এখন আর 
"সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর নামক পর্যটন স্পটে দাঁড়িয়েই এ কথাগুলো বলছিলেন সেখানকার স্থানীয় সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান রিপন।তার মতো বহু মানুষের বক্তব্য উঠে এসেছে গনমাধ্যমগুলোতে।মঙ্গলবার সকালে সাদা পাথরের ওই স্থানে গিয়ে তিনি সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেই তিনি গনমাধ্যমে তুলে ধরে জানান,আগের সাথে তুলনা করতে গেলে এখন ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর নেই বললেই চলে।
তিনি বলেন, "আগের সাথে তুলনা করলে বলা যায় প্রায় ৭৫ শতাংশ পাথর এখান থেকে তুলে নিয়ে গেছে।২৫ শতাংশ পাথর এখন এখানে আছে,যেটা বিজিবির ক্যাম্পের সাথে লাগোয়া স্থানে আছে।"প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ধলাই নদের উৎসমুখে ভেসে আসা পাথরের বিশাল স্তুপের কারণে প্রায় পাঁচ একর জায়গা জুড়ে তৈরি এস্থানটি পর্যটন স্পট হিসেবে গত কয়েকবছরে বেশ সাড়া ফেলেছিল। 
গনমাধ্যম বল্ছে,স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে সাদাপাথর তুলে নিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে পরিবেশবিদ কাসমির রেজা অভিযোগ করেন,এক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর অভিযান দেখা যাচ্ছে না।তবে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদের দাবি প্রশাসনের পদক্ষেপ চলমান রয়েছে এবংপ্রায় প্রতিদিনই অভিযান চলছে।
এক ভিডিও ফুটেজেও দেখা যায় মি.মুরাদ গনমাধ্যমকে বলছেন,"আমাদের পদক্ষেপ চলমান আছে।আইনি যত প্রক্রিয়া করা যায় আমরা সবগুলাই করেছি।এখানে মোবাইল কোর্টসহ টাস্কফোর্সের অভিযান এবং বিভিন্ন সময় নিয়মিত মামলা পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছে।"এরপরেও কেন পাথর লুট বন্ধ করা যাচ্ছে না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মি.মুরাদ বলেন,"তারপরেও এরকম অবস্থা।গতকালকেও আমাদের অভিযান হয়েছে। আজকেও ইনফ্যাক্ট অভিযান হবে।তারপরেও কেন এরকম হচ্ছে সেটা জানার জন্য আগামীকাল একটা সভা ডেকেছি আমরা।সভা করে এ বিষয়টা আমরা বোঝার চেষ্টা করবো।সে অনুযায়ী আমরা বিকল্প বা অন্য করণীয় আছে কিনা তা নির্ধারণ করবো।"
গনমাধ্যম তার প্রতিবেদনে আরও বলছে, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক মি. রেজা মনে করেন প্রশাসন কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।কেন সাদা পাথর নামে পরিচিত ও কিভাবে তৈরি হয় তার কারণ জানতেই উঠে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। 
সিলেট নগরী থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ।
ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো থেকে যে নদীর উৎপত্তি হয়ে ভোলাগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সেই নদীর নাম ধলাই নদ।পাহাড় থেকে ঝর্ণার পানির স্রোতে এই নদী বেয়েই সাদা পাথর নেমে আসে।ধলাই নদের উৎসমুখের এই জায়গার নাম ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্ট।ঠিক এক বছর আগের এই স্থানের সৌন্দর্যকে 'অনবদ্য ক্যানভাসের' সাথে তুলনা করেন কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক শাফকাত জামিল।
"যতদূর চোখ যায় দুইদিকে কেবল সাদাপাথর R মাঝখানে স্বচ্ছ নীল জল আরেকদিকে পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন। আপনার মনে হবে কাশ্মীরের মতো স্বর্গরাজ্য।সৌন্দর্যের এক অনবদ্য এক ক্যানভাস " এমনটাই গনমাধ্যমকে বলেন মি. জামিল।
তিনি আরও জানান, এই স্থান গত দশ - বারো বছরে মূলত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশি পরিচিতি পেয়েছে।কারণ হিসেবে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির কথা গনমাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি। ২০১২ সাল থেকে মূলত এই স্থানটি পর্যটন স্পটে পরিণত হয়।
পাশাপাশি স্থানীয় সাংবাদিকরাও জানান, সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জের রাস্তা একসময় খুব খারাপ ছিল।পাথর পরিবহনের কারণে সিলেটের সবচেয়ে খারাপ রাস্তা ছিল সিলেট টু ভোলাগঞ্জের রাস্তা।কিন্তু রাস্তা ভালো হওয়ার পরে সিলেট শহর থেকে সাদা পাথর নামে পরিচিত ওই স্থানে যেতে মাত্র ৪০ মিনিট সময় লাগে।
এছাড়া "কোন পর্যটক যদি মনে করেন সিলেট শহরে থেকে নানা স্থানে ঘুরবেন তাহলে সাদা পাথরে আসতে তার মাত্র ৪০ মিনিট লাগবে। এ কারণে রাস্তা ভালো হওয়ার পর পর্যটকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এখন এখানে। ট্যুরিস্ট স্পট পরিচিতি পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের ভিড় হয় প্রচুর।"
এদিকে সিলেটের পরিবেশবিদ মি.রেজা গনমাধ্যমকে জানান ভোলাগঞ্জ থেকে সাদা পাথর তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।এমনকি লিজও দেওয়া হয়নি ওই স্থান।
তিনি আরও বলেন,"গত চার বছরে এখান থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়নি,এখনতো প্রশাসনের কার্যকর অভিযানও দেখছি না।"
স্থানীয়রা বলছেন , ওই স্থানের একশ মিটারের মধ্যে অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্পের কাছে শুধুমাত্র সাদা পাথর এখন অবশিষ্ট রয়েছে। বিজিবি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে এই সাদা পাথর পর্যটন স্পট অবস্থিত।এরই মধ্যে গত সোমবার সাদা পাথর লুট বন্ধ করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে।যেসব নৌকায় করে পাথর তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেগুলো অকার্যকর করে দেওয়া হয়।অভিযানের পর মঙ্গলবার আর কেউ পাথর লুট করতে সেখানে যায়নি বলে জানান ভোলাগঞ্জে উপস্থিত থাকা স্থানীয় সাংবাদিকসহ অন্যানরা।কিন্ত যা হবার হয়ে গেছে আর তেমন কিছু হবার নেই, এখন শুধুই বালি আর পানি পড়ে আছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। 
মি. রহমান গনমাধ্যমকে জানান, পাঁচই অগাস্টের পর থেকে মূলত সাদা পাথর লুট হওয়া শুরু হয়। প্রশাসনে যে স্থবিরতা বা ভীতিই এই পাথর লুট হওয়ার কারণ। প্রশাসনের কঠোর না হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া গণমাধ্যমের কিছু ভিডিওতে দেখা যায়,এই সপ্তাহের শুরুর দিকে নৌকায় করে সাদা পাথর তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি গর্ত খুঁড়েও পাথর তুলতে দেখা যায় এসব ভিডিওতে।
স্থানীয় সাংবাদিকরা সেখানে বলছেন, প্রশাসনের কঠোর না হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পরিবেশগতভাবে এই 'সাদা পাথর' স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা না থাকার কারণে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে বলে পরিবেশবিদদের দাবি।
গনমাধ্যম বলছে, পরিবেশবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই স্থানের গুরুত্ব অপরিসীম।কেননা স্বচ্ছ পানির এ আধার এই এলাকার বেশ কিছু স্থানের খাবার পানির চাহিদা মেটায়।
"প্রথম গুরুত্ব হচ্ছে এই পাথরগুলো যেখান থেকে ন্যাচারালি আসে, ওইখান থেকে পানি প্রবাহের ভয়ঙ্কর রকম তোড় তৈরি হয়।মানে পানি প্রবাহের তীব্রতা বেড়ে যায়।যেখানে তোড় বেশি সেখানে পাথর জমে। পাথরের কাজ হয় ওই তোড়ের পানিটাকে ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো করে তার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা।এটা একটা প্রাকৃতিক ধাপ"এমনটাই গনমাধ্যমকে বলেন মি. হাবিব।শুধু তাই নয় পানির মধ্যে অক্সিজেন সংশ্লেষ করাও এর কাজ যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায়'সোলার অ্যাকুয়াটিক ন্যাচারাল প্রসেস অব ট্রিটমেন্ট' বলা হয় বলে জানান তিনি।প্রকৃতির এই পুরো সিস্টেমে যদি কোন ব্যাঘাত ঘটানো হয় অর্থাৎ পাথর তুলে ফেলা হলে তখন সিস্টেম ভেঙে পড়ে বলে সাংবাদিকদের জানান এই পরিবেশবিদ।তিনি আরও বলেন "এর ফলে দু'পাশে প্লাবনের পরিমাণও বাড়ে,ভাঙনের সৃষ্টি হয় এবংপানিটাকে গোড়াতেই সাংঘাতিকভাবে পলিউটেড(দূষিত)করে ফেলে।
এছাড়া মনে রাখা দরকার ওই অঞ্চলের অনেক জায়গায় খাবার পানির স্বল্পতা মেটায় এই পানি"। এসব ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের কারণে প্রকৃতিগতভাবে অন্যান্য ক্ষতি তৈরির অভিঘাত সৃষ্টি হয় বলেও মনে করেন তিনি।
কিন্তুদুঃখজনক,লাইলা কিছুই বল্ল না।সিলেট ভোলাগঞ্জের কাশ্মীরী সৌন্দর্য সৃষ্টিকারী সাদা পাথর সৌন্দর্যের স্বর্গরাজ্যে সৃষ্টি করা সাদা পাথরঘেরা সেই সৌন্দর্য আর সেই সৌন্দর্য নেই ভেবেই নির্বাক,নিরব নিথর পাথরের মূর্তি এক জিন্দালাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাইলা।


এ জাতীয় আরো খবর