চলমান উত্তেজনা ও আস্থাহীনতার মাঝেও ইরান ও ইউরোপের তিন দেশ-ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি আবারও বসেছে পারমাণবিক আলোচনার টেবিলে। দ্বিতীয় দফার এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে শুক্রবার (২৫ জুলাই) তুরস্কের ইস্তানবুলে, ইরানি দূতাবাস প্রাঙ্গণে। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠক হয়েছে পুরোপুরি বদ্ধদ্বার বৈঠক হিসেবে, যেখানে সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিল না।
ইরানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি এবং পারমাণবিক আলোচনায় বিশেষজ্ঞ কূটনীতিক কাজেম ঘারিবাবাদি। ইউরোপীয় অংশীদাররা চেয়েছিল ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) ফিরে আসার জন্য ইরানকে রাজি করাতে, এবং এই সংলাপ তারই অংশ।
এক কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, “সংলাপ ছিল টেকনিক্যাল, স্পষ্ট ও খোলামেলা। তবে কোনো তাৎক্ষণিক অগ্রগতি হয়নি। তবে ভবিষ্যতের জন্য দরজা খোলা রাখা হয়েছে।”
এর আগে গত ১৬ মে ইস্তানবুলেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম দফা বৈঠক, যেখানে উভয় পক্ষ ইউরোপীয় মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ সংলাপের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করার উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু ১৩ জুন ইসরায়েলের অভিযানে ইরানের একটি সামরিক স্থাপনায় বিস্ফোরণ এবং পরে ইরান সরকার তা ‘সাবোটাজ ও যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে দাবি করলে আলোচনা প্রক্রিয়ায় বড় ধাক্কা লাগে। ওই ঘটনার জেরে স্থগিত হয় ওয়াশিংটন–তেহরান মধ্যস্থ সংলাপ ও ইউরোপীয় পক্ষের কূটনৈতিক উদ্যোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিতীয় দফা বৈঠক মূলত উত্তেজনার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার একটি প্রচেষ্টা। বৈঠকে উপস্থিত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাই সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে। চুক্তিতে প্রত্যাবর্তন সম্ভব, তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সম্মান ছাড়া তা হবে না।”
আলোচনায় ইরান পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পরমাণু গবেষণার অধিকার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে আশ্বাস চাওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই বহুপাক্ষিক জেসিপিওএ (JCPOA) চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান। এতে চুক্তির অন্যান্য পক্ষ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া এবং চীন হতবাক হয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়, যার ফলে ইরানের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়ে।
ইরান তার পরমাণু কার্যক্রম ধাপে ধাপে বাড়াতে থাকে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে যায়-এতে করে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ে।
এই বৈঠক শেষে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয়নি। তবে ইরান-সংক্রান্ত ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের জন্য আলোচনার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলবে, যদিও তাৎক্ষণিক কোনো অগ্রগতি না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিপ্লোম্যাটিক রিসেট’।
একজন তুর্কি কূটনৈতিক বলেন, “তুরস্ক বরাবরই ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা করে এসেছে। ইস্তানবুলে এই বৈঠক সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলো।”
পরমাণু ইস্যু নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস এখনও বড় বাধা। তবে এই বৈঠক দেখিয়েছে, সবকিছুর পরও আলোচনার দরজা একেবারে বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘূর্ণিতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠা মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের কূটনৈতিক সংলাপ শান্তি ও স্থিতিশীলতার একটি ক্ষীণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আশার রেখা তৈরি করেছে।
কী ওয়ার্ডসঃ ইরানপারমাণবিকআলোচনা, IranNuclearTalks, ইস্তানবুলসংলাপ, IranEUdialogue, DiplomaticReset2025