শুক্রবার, মে ১, ২০২৬

কলকাতায় বাংলাদেশি নেতাদের ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’-নতুন জোট রাজনীতির ইঙ্গিত?

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৫-০৭-১৯ ০১:৪৩:৪৪

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর যে সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়-সরাসরি ছায়া ফেলছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মঞ্চেও। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বক্তব্যকে ঘিরে ফের সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা কি কেবল রাজনৈতিক আশ্রয় নিচ্ছেন, নাকি এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অঙ্গ?
১৮ জুলাই নিউটাউনে এক সরকারি অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, “ভারত সরকার তো আমাদের অতিথি হিসেবে কয়েকজনকে রেখেছে, আমি কি ‘না’ বলেছি?থাকতে দিইনি? কারণ, পার্শ্ববর্তী দেশ বিপদে পড়েছে-এমন রাজনৈতিক বিষয় আছে।”
এই বক্তব্যে তিনি কৌশলে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলেছেন-যে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত কিছু রাজনৈতিক নেতা এখন ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন, আর কেন্দ্রীয় সরকার নিজ দায়িত্বেই তাদের আশ্রয় দিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে চলতি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দেশের সাবেক ক্ষমতাসীন দলের (আওয়ামী লীগ) একাধিক শীর্ষ নেতা কলকাতায় পাড়ি জমান।
এদের মধ্যে আছেন-
সাবেক একাধিক মন্ত্রী
অন্তত ৫ জন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য
দলীয় নীতিনির্ধারক স্তরের নেতা
একাধিক যুব ও ছাত্র সংগঠনের সাবেক নেতা

এই নেতাদের কেউ পরিবারসহ, কেউ একা ভারতে অবস্থান করছেন। শুরুতে তারা ‘পারিবারিক চিকিৎসা’ বা ‘নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি’র কারণ দেখিয়ে দেশ ছাড়েন। কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে এটি আর নিছক নিরাপত্তার বিষয় নেই, বরং একটি সম্ভাব্য ‘রাজনৈতিক কৌশলের’ ইঙ্গিত হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, ভারতের মাটি থেকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরির কৌশল তৈরি হতে পারে। আর এ কাজে ভারত সরকারের অংশগ্রহণ শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) দপ্তর, RAW, ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পরবর্তী সম্পর্ক কেমন হবে-তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। প্রশ্ন উঠছে-কলকাতায় আশ্রিত বাংলাদেশি নেতাদের ব্যবহার করে ভারত কি নতুন কোনো কনসার্ট বা “এক্সাইল-অপজিশন ফর্মেশন” গড়তে যাচ্ছে?
ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ একে বলছেন “পলিটিকাল হসপিটালিটি”-অর্থাৎ পার্শ্ববর্তী দেশের নেতাদের সুরক্ষা দিয়ে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা। কিন্তু অন্য পক্ষ বলছে, এটি আসলে ‘সফট প্রেসার’ স্ট্র্যাটেজি, যার মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অব্যক্ত বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষক মেজর (অব.) আনিসুর রহমান বলেন, “এটি খুবই স্পষ্ট যে ভারত এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গঠনমূলক বিরোধী শক্তি চায়-যা তাদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্য স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাই তারা ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘ব্যাকআপ টিম’ তৈরি করে রাখতে পারে কলকাতার মাটিতে।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। তার প্রশ্ন-“আপনারা একদিকে বাংলাদেশি নেতা অতিথি করে রাখবেন, আবার বাংলা ভাষাভাষীদের রোহিঙ্গা বলবেন?”
এ বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, বরং তিনি বিজেপির অভ্যন্তরীণ ‘বাঙালি-বিদ্বেষী’ রাজনীতিকেও একহাত নিলেন।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই নীরবতা ‘সাংবিধানিক’ হলেও বাস্তবে এটি ‘চাপ ও সন্দেহ’-এর বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষ করে যদি দেখা যায়, ভবিষ্যতে ওই আশ্রিত নেতারা ভারতে থেকে “প্রবাসী রাজনৈতিক মঞ্চ” গড়েন, তবে সেটি বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো—
-ভারত কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক শক্তির সূচনার প্রেক্ষাপট গড়ছে?
-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রতিবাদ’ কি প্রদেশ ও কেন্দ্রের সংঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ?
-আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি এবার ‘প্রবাস-ভিত্তিক বিরোধী জোট’-এর সূচনা ঘটবে?

একটা বিষয় পরিষ্কার-বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। এবং এটি শুধু দু’দেশের কূটনীতিতে নয়, পরবর্তী নির্বাচনপূর্ব রাজনীতির কাঠামোতেও প্রভাব ফেলবে নিশ্চিতভাবেই।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট। 


এ জাতীয় আরো খবর