ঢাকা, ৩ জুলাই ২০২৫
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছালেও, এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো পূর্ণ সমঝোতা হয়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চলমান সংলাপে এ নিয়ে বেশ কয়েকটি ভিন্নমত ও প্রস্তাব উঠে এসেছে, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
এক সময় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতের একটি রায়ে সংশোধনীর দুটি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এই প্রেক্ষাপটে, চলমান সংলাপে অংশ নেওয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই মনে করছে, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-কে হবেন সেই সরকারের প্রধান?
সংবিধানের তৎকালীন ১৩তম সংশোধনী অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করার বিধান ছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক দল, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সীমিত রাখতে চায়।
তবে বিএনপি প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতিকে বিকল্প বিবেচনায় রাখতে রাজি বলে জানায়।
অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, এখন আলোচনায় এসেছে একটি বিকল্প নিয়োগ পদ্ধতির প্রস্তাব।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রস্তাব করেছে, সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগে ১১ সদস্যের একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের, যারা ৯ জন নির্দলীয় ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। এরপর ভোটের মাধ্যমে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চূড়ান্ত করা হবে। প্রয়োজনে র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং ব্যবহার করা হবে।
নাগরিক কোয়ালিশন বলছে, এই দায়িত্ব নিতে পারে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি, যারা ভোটাভুটির মাধ্যমে একজন নিরপেক্ষ উপদেষ্টা বাছাই করবে।
অন্য একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, স্পিকার, সংসদ নেতা ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত একটি অনুসন্ধান কমিটি উপদেষ্টা মনোনয়নে সহায়তা করতে পারে।
এইসব বিকল্প রূপরেখা এখন আলোচনার টেবিলে আছে। তবে কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার বাছাইয়ে স্বচ্ছতা ও সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যত একমত হলেও প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তবে ইতোমধ্যেই দলগুলো অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে।”
তার মতে, “গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেউ যেন মনে না করে-উপদেষ্টার মনোনয়ন কোনো একক গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পেছনে মূল ভিত্তি ছিল সুপ্রিম কোর্টের একটি পূর্ণাঙ্গ রায়। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর দুটি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, যা আপিল বিভাগে রিভিউর অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে রাজনৈতিকভাবে একটি সহমত গড়ে তোলা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কেননা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সাংবিধানিক সমন্বয় এখন জরুরি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, জুলাই মাসের মধ্যে একটি চূড়ান্ত “জুলাই সনদ” প্রকাশ করার লক্ষ্যে তারা কাজ করছে। এই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো, মেয়াদ, দায়িত্ব ও উপদেষ্টার মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
একইসঙ্গে একটি আলাদা পরামর্শ কমিটি গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে, যারা উপদেষ্টা নিয়োগসংক্রান্ত প্রতিটি প্রস্তাব খতিয়ে দেখে একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা কমিশনের হাতে তুলে দেবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি হলেও প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে এখনো রয়েছে মতবিরোধ। তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চলমান আলোচনায় যে প্রগতি হয়েছে, তাতে আশা করা যায়-চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে দেশ আর বেশি দূরে নয়।