ঢাকা | ২৫ জুন ২০২৫
জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের খসড়া রূপরেখা তৈরিতে বড় ধরনের সমন্বয় আনলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক মতানৈক্যের মুখে সংবিধানের উপর নির্ভরশীল নিয়োগ কাঠামো ‘জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ (এনসিসি)’-এর প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে কমিশন। পরিবর্তে কমিশন এবার সামনে আনছে একটি ‘সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’, যা তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের এবং নতুন কাঠামোতে প্রস্তাবিত।
এই ঘোষণা এসেছে কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের কণ্ঠে। আজ বুধবার (২৫ জুন), রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ষষ্ঠ দিনের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের দিনব্যাপী সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে তিনি এ কথা জানান।
কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, “বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এনসিসি নিয়ে একমত হতে পারেনি। তাই আমরা বাস্তবতা মেনে প্রস্তাবটি বদলে দিচ্ছি। একটি পরিমার্জিত ও সীমিত দায়িত্বের ‘নিয়োগ কমিটি’ গঠন করা হবে, যা কেবল সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। তবে এই কমিটির আওতায় অ্যাটর্নি জেনারেল ও তিন বাহিনীর প্রধানের মতো পদ অন্তর্ভুক্ত থাকছে না।”
অধ্যাপক রীয়াজ আরও বলেন, যদিও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামোর মৌলিক বিষয়গুলোতে মত দিয়েছে, তবুও পদ্ধতিগত বিশদ আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।
“আমরা এখনো সব দলের মতামত নিয়ে কাঠামোর পরিপূর্ণতা যাচাই করছি। এর মধ্যে কিছু প্রক্রিয়াগত ও কৌশলগত অংশে ভিন্নমত আছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।”
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কারণ, নিয়োগ কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একাধিক মত রয়েছে।
“সংবিধান পরিবর্তন ছাড়াই সংস্কার সম্ভব কি না-সেটি নিয়েও মতবিরোধ আছে,” বলেন আলী রীয়াজ।
প্রস্তাবিত জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি মূলনীতি-সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সম্প্রীতি- নিয়ে বেশিরভাগ দল একমত হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান মূলনীতি অক্ষুণ্ন রাখার প্রশ্নে মতভেদ প্রকট। কেউ কেউ বর্তমান কাঠামো সমর্থন করেছে, আবার কেউ মৌলিক সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে।
আলোচনার বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে বলেও জানান রীয়াজ।
“বৈঠকের বাইরেও মতবিনিময় হচ্ছে। এটা একটি ইতিবাচক দিক। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই পরিপক্বতা গুরুত্বপূর্ণ।”
আজকের আলোচনায় অংশ নেয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।
কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, বেসরকারি সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, অর্থনীতিবিদ ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলমান আলোচনা ও সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী জুলাই মাসেই জাতীয় ঐকমত্যের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে চায় তারা। এর আগে, আসন্ন রোববার আবারো দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘এনসিসি’ থেকে সরে এসে ‘নিয়োগ কমিটি’র প্রস্তাব অনেকেই দেখছেন কমিশনের কৌশলগত বাস্তবতা স্বীকার হিসেবে। যদিও এটি একটি পিছু হটার মতো সিদ্ধান্ত, তবুও এটি রাজনৈতিক সমঝোতার পথে সম্ভাব্য অগ্রগতি বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংবিধানিক সংস্কারের স্পর্শকাতর জায়গায় একচেটিয়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে বহুপক্ষীয় মতামতের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক উদ্যোগের বড় শক্তি হতে পারে।